শীতের রাতে বৃদ্ধা ভানুর গল্প: পুরো ঘটনাটি কী ছিল?

পরিবারের সবার সামনে ঘটা একটি মজার ঘটনা, যা হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর স্ত্রী নিজে হাসতে হাসতে বলেছিলেন। অর্ধেক উদ্ধৃতিতে সেটিই হয়ে গেল অভিযোগ।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

কাদিয়ানের পাশের এক গ্রাম থেকে আসা এক বৃদ্ধা। নাম ভানু। বহু বছর ধরে তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর পরিবারে কাজ করতেন। বাড়ির মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন প্রায় পরিবারেরই একজন, আর তাঁর ভক্তি ছিল সরল গ্রামীণ মানুষের মতো।

এক প্রচণ্ড শীতের রাতে এই বৃদ্ধাকে নিয়ে একটি ছোট্ট ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনাটিকেই পরে আপত্তির রূপ দেওয়া হয়েছে।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.) সংকলিত সীরাতুল মাহদী গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বাড়িতে ভানু নামে এক মহিলা কাজ করতেন, আর তিনি রাতে তাঁর পা টিপে দিতেন। এই অর্ধেক কথাটুকু বলে তাঁরা একটি খারাপ ইঙ্গিত দিতে চান।

পুরো বর্ণনাটি

সীরাতুল মাহদীর সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি (বর্ণনা নম্বর ৭৮০) কার মুখ থেকে এসেছে, সেটিই প্রথম লক্ষণীয়। এটি বর্ণনা করেছেন ডা. মীর মুহাম্মদ ইসমাঈল সাহেব, আর তিনি শুনেছেন তাঁর বোন, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সহধর্মিণী হযরত সৈয়দা নুসরত জাহান বেগম (রা.)-এর কাছ থেকে।

ঘটনাটি এমন: ভানু নামে এক বৃদ্ধা কাজের মহিলা এক প্রচণ্ড শীতের রাতে হুযূরের পা টিপে দিতে বসলেন। তিনি লেপের উপর দিয়েই টিপছিলেন, তাই বুঝতে পারেননি যে তিনি আসলে পা নয়, খাটের কাঠের পাটাতন টিপছেন। কিছুক্ষণ পর হযরত মির্যা সাহেব রসিকতা করে বললেন, “ভানু, আজ অনেক শীত পড়েছে, তাই না?” ভানু উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ভীষণ শীত, দেখুন না, আপনার পা কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে!”

বর্ণনার শেষে বলা হয়েছে, ভানু কাদিয়ানের কাছের গ্রামের মানুষ ছিলেন, আর ছিলেন নিষ্ঠাবান ও ধার্মিক মহিলা।

✦

গল্পটি আসলে কী বলে

এবার পুরো ছবিটা দেখুন। ঘটনাটির বর্ণনাকারী তাঁর নিজের স্ত্রী। তিনি এটি বলেছেন একটি হাসির গল্প হিসেবে। ভানু এত বয়স্ক যে, খাটের কাঠ আর মানুষের পায়ের পার্থক্যও বুঝতে পারেননি। পরিবারের মধ্যে, সবার জানাশোনায়, প্রকাশ্যে ঘটা একটি সরল ঘটনা।

কোনো গোপন বা লজ্জাজনক বিষয় হলে একজন স্ত্রী কি তা হাসির গল্প হিসেবে ভাইকে শোনাতেন? আর সেই ভাই কি তা বইয়ে ছাপার জন্য দিতেন? ঘটনাটি নিজেই প্রমাণ করে, এতে আপত্তির কিছু ছিল না। আসলে এটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কোমল রসবোধ আর বাড়ির বয়স্ক মানুষদের প্রতি তাঁর স্নেহের একটি ছোট্ট ছবি।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

একজন বেগানা নারী কি পা টিপে দিতে পারেন?

এখানে কেউ কেউ বলেন, পর্দার বিধান অনুযায়ী এটা ঠিক হয়নি। চলুন দেখি, মহানবী (সা.)-এর জীবনে এমন ঘটনা আছে কি না। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন:

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدْخُلُ عَلَى أُمِّ حَرَامٍ بِنْتِ مِلْحَانَ، وَكَانَتْ تَحْتَ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، فَدَخَلَ عَلَيْهَا يَوْمًا فَأَطْعَمَتْهُ، وَجَعَلَتْ تَفْلِي رَأْسَهُ، فَنَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم
“রসূলুল্লাহ (সা.) উম্মে হারাম বিনতে মিলহানের কাছে যেতেন; তিনি ছিলেন উবাদা ইবনুস সামিতের স্ত্রী। একদিন তিনি তাঁর কাছে গেলেন, তিনি তাঁকে খাবার খাওয়ালেন এবং তাঁর মাথার চুলে উকুন খুঁজে দিতে লাগলেন। তখন রসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমিয়ে পড়লেন…”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তা‘বীর, হাদীস ৭০০১

এই হাদীস নিয়ে আলেমরা নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কিন্তু কোনো মুসলমান এর ভিত্তিতে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। সবাই বোঝেন, প্রসঙ্গ, সম্পর্ক আর পরিবেশ দেখে ঘটনার বিচার করতে হয়। সেই একই ন্যায্যতা এখানেও প্রাপ্য: একজন অতি বৃদ্ধা, বহু বছরের পুরোনো গৃহকর্মী, পরিবারের উপস্থিতিতে, শীতের রাতে লেপের উপর দিয়ে সেবা করতে বসেছিলেন।

তাহলে এমন ঘটনা বইয়ে লেখা হলো কেন?

কারণ সীরাতুল মাহদী হলো হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর জীবনের ছোট-বড় সব ঘটনার সরল সংকলন। যাঁরা কিছু লুকানোর প্রয়োজন বোধ করেন, তাঁরা এমন ঘটনা ছাপেন না। খোলা মনে সব ঘটনা লিপিবদ্ধ করাই প্রমাণ করে, তাঁদের কাছে এতে লুকানোর মতো কিছু ছিল না।

নবী-সংস্কারকদের ঘরোয়া জীবনের এমন খুঁটিনাটি কেন লেখা হয়?

কেউ কেউ ভাবেন, একজন ধর্মীয় নেতার জীবনী মানে শুধু বড় বড় ঘটনা। কিন্তু হাদীসের ভাণ্ডার দেখুন। সেখানে মহানবী (সা.)-এর ঘরোয়া জীবনের অসংখ্য ছোট ঘটনা যত্ন করে সংরক্ষিত আছে। হযরত আসওয়াদ (রহ.) একবার হযরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, মহানবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন:

كَانَ يَكُونُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ ـ تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ ـ فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلاَةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلاَةِ
“তিনি ঘরের লোকদের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, অর্থাৎ পরিবারের সেবা করতেন; আর যখন নামাযের সময় হতো, তিনি নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল আযান, হাদীস ৬৭৬

এই ছোট ছোট বর্ণনাই আমাদের দেখায়, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা ঘরের ভেতরে কেমন মানুষ ছিলেন। সীরাতুল মাহদীও একই কাজ করেছে। ভানুর গল্পে আমরা দেখি একটি সরল, স্নেহময় পরিবার: এক বৃদ্ধা কর্মী, যিনি ভক্তিতে সেবা করতে চান; আর একজন গৃহকর্তা, যিনি তাঁর ভুল দেখে বকা না দিয়ে মৃদু রসিকতা করেন। গল্পটির আসল শিক্ষা হলো কোমলতা আর বয়স্কদের প্রতি সম্মান।

তাই এই আপত্তির শিক্ষা আমাদের সবার জন্য। কারও জীবনের কোনো ঘটনা শুনলে আগে দেখতে হবে, পুরো বর্ণনাটি কী, কে বর্ণনা করেছেন, আর কোন পরিবেশে ঘটেছে। এখানে পুরো বর্ণনা পড়লে একটি নির্দোষ, মিষ্টি পারিবারিক স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। সেই স্মৃতিকে বিকৃত করে অভিযোগ বানানো সত্যের প্রতি অবিচার। কুরআন আমাদের শিখিয়েছে, অপবাদ শুনলে মুমিনের প্রথম কাজ ভালো ধারণা পোষণ করা (সূরা আন-নূর ২৪:১৩)। পুরো বর্ণনা সামনে থাকলে ভালো ধারণা পোষণ করা তো আরও সহজ।

সংক্ষেপে

  1. সীরাতুল মাহদীর বর্ণনাটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর স্ত্রী হযরত নুসরত জাহান বেগম (রা.) নিজে একটি হাসির ঘটনা হিসেবে বলেছিলেন।
  2. ভানু ছিলেন অতি বৃদ্ধা, ধার্মিক গৃহকর্মী, যিনি লেপের উপর দিয়ে খাটের কাঠকে পা ভেবে টিপছিলেন।
  3. অর্ধেক উদ্ধৃতি দিয়ে ঘটনাটিকে বিকৃত করা হয়েছে; পুরো বর্ণনায় আপত্তির কিছু নেই।
  4. প্রসঙ্গ দেখে বিচারের যে ন্যায্যতা আমরা সহীহ বুখারীর ৭০০১ নম্বর হাদীসের ক্ষেত্রে করি, এখানেও সেটিই প্রযোজ্য।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.