‘আল্লাহ কাদিয়ানে অবতীর্ণ হবেন’: এর অর্থ কী?

সহীহ বুখারী বলছে, আল্লাহ প্রতি রাতে নিকটতম আকাশে নেমে আসেন। তাহলে আল্লাহর ‘অবতরণ’ কথাটির মানে কী, আর এতে আপত্তির কী আছে?

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

রাতের শেষ প্রহর। চারদিক নিস্তব্ধ। একজন মুসলমান ঘুম ভেঙে উঠে তাহাজ্জুদে দাঁড়ালেন। তিনি জানেন, এই সময়টি বিশেষ। কারণ মহানবী (সা.) বলে গেছেন, এই সময়ে আল্লাহ নিজে বান্দার কাছে নেমে আসেন।

এই হাদীস প্রতিটি মুসলমানের পরিচিত। অথচ একই ধরনের একটি কথা যখন একটি ইলহামে আসে, তখন তা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা তাযকেরাহ (৪র্থ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৩৫৮)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি ইলহাম হলো, “আল্লাহ নিজের ওয়াদা অনুযায়ী কাদিয়ানে অবতীর্ণ হবেন।” তাঁদের প্রশ্ন, আল্লাহ কি কোনো নির্দিষ্ট শহরে নেমে আসেন? এ কি আল্লাহর মর্যাদার পরিপন্থী নয়?

আল্লাহর “নেমে আসা” মানে কী

মহানবী (সা.) বলেছেন:

يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ
“আমাদের বরকতময় ও মহান প্রতিপালক প্রতি রাতে, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে, নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আছে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?…”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, হাদীস ১১৪৫

কোনো মুসলমান এই হাদীস পড়ে মনে করেন না যে, আল্লাহ শরীর নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যান। সবাই বোঝেন, এর অর্থ আল্লাহর রহমত, সাড়া আর নৈকট্য বিশেষভাবে প্রকাশিত হওয়া। কারণ কুরআন নিজেই বলেছে, “কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে” (সূরা আশ-শূরা ৪২:১২)। সৃষ্টির মতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কুরআনেও আল্লাহর “আসা”র কথা আছে:

وَّجَآءَ رَبُّکَ وَالۡمَلَکُ صَفًّا صَفًّا
“এবং তোমার প্রতিপালক আগমন করিবেন এমতাবস্থায় যে, ফিরিশ্‌তাগণ সারি সারি দণ্ডায়মান থাকিবে;”
সূরা আল-ফাজর ৮৯:২৩
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৮৯:২২ ও ২:২১০।
ہَلۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیَہُمُ اللّٰہُ فِیۡ ظُلَلٍ مِّنَ الۡغَمَامِ وَالۡمَلٰٓئِکَۃُ
“তাহারা কি কেবল ইহারই প্রতীক্ষায় আছে যে, আল্লাহ্ মেঘের আবরণে তাহাদের নিকট আগমন করুন এবং ফিরিশ্‌তাগণও…”
সূরা আল-বাকারা ২:২১১

এসব আয়াতে আল্লাহর আগমন মানে তাঁর ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত ও নিদর্শনের প্রকাশ। একই অর্থে ইলহামটি বলছে, আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাদিয়ানে নিজের নিদর্শন প্রকাশ করবেন, অর্থাৎ যেখানে তাঁর প্রেরিত বান্দা আছেন, সেখানে তাঁর সাহায্য ও সমর্থন দেখা যাবে।

✦

প্রতিশ্রুত মসীহের সঙ্গে আল্লাহর কথা

“নিজের ওয়াদা অনুযায়ী” কথাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে হযরত নাওয়াস ইবনে সাম‘আন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে শেষ যুগের মসীহ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

إِذْ أَوْحَى اللَّهُ إِلَى عِيسَى إِنِّي قَدْ أَخْرَجْتُ عِبَادًا لِي لاَ يَدَانِ لأَحَدٍ بِقِتَالِهِمْ
“…তখন আল্লাহ ঈসার প্রতি ওহী করবেন: আমি আমার এমন কিছু বান্দাকে বের করেছি, যাদের সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য কারও নেই…”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান

অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগমনকারী মসীহের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন, তাঁকে ওহী করবেন। যেখানে আল্লাহর প্রত্যাদিষ্ট বান্দা থাকেন, সেখানে আল্লাহর বাণী ও নিদর্শন নেমে আসাই স্বাভাবিক। বরং উল্টোটা হলেই প্রশ্ন উঠত: এ কেমন প্রতিশ্রুত মসীহ, যার কাছে আল্লাহর সাহায্য আসে না?

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

একটি নির্দিষ্ট জনপদের নাম কেন?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ তো সর্বত্র, একটি গ্রামের নাম নেওয়া কেন? চলুন দেখি। কুরআনে আছে, হযরত মূসা (আ.)-কে “বরকতপূর্ণ ভূখণ্ডে” একটি বৃক্ষের কাছ থেকে ডেকে আল্লাহ বলেছিলেন, “হে মূসা! নিশ্চয় আমি আল্লাহ্ সমগ্র জগতের প্রতিপালক” (সূরা আল-কাসাস ২৮:৩১)। আর আল্লাহ সিনাই পর্বত ও মক্কাকে, “এই নিরাপদ শহর”, বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন (সূরা আত-তীন ৯৫:৩-৪)। আল্লাহ সর্বত্র থাকেন, কিন্তু তাঁর বিশেষ নিদর্শন বিশেষ স্থানে, বিশেষ বান্দার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে আল্লাহ সীমাবদ্ধ হন না, বরং সেই স্থান বরকতময় হয়।

এটি কি আল্লাহকে শরীরী বানানো নয়?

না। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ সব রকম শরীর ও সীমা থেকে পবিত্র। যে অর্থে প্রতি রাতে আল্লাহর নেমে আসার হাদীসকে আমরা বুঝি, ঠিক সেই অর্থেই এই ইলহাম। এক জায়গায় যে শব্দ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, অন্য জায়গায় সেটিকেই আপত্তির বিষয় বানানো ন্যায্য নয়।

“নিজের ওয়াদা অনুযায়ী”: কোন ওয়াদা?

কুরআনে আল্লাহ তাঁর রসূলদের সঙ্গে একটি স্থায়ী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:

اِنَّا لَنَنۡصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَیَوۡمَ یَقُوۡمُ الۡاَشۡہَادُ
“নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রসূলগণকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে অবশ্যই সাহায্য করিব, পার্থিব জীবনেও এবং ঐ দিবসেও যখন সাক্ষীগণ দাঁড়াইবে,”
সূরা আল-মু’মিন ৪০:৫২

এটি আল্লাহর সাধারণ নিয়ম: যাঁকে তিনি পাঠান, তাঁকে তিনি একা ছেড়ে দেন না। তাঁর সাহায্য সেই বান্দার আশপাশে নেমে আসে। ইলহামের “নিজের ওয়াদা অনুযায়ী” কথাটি এই প্রতিশ্রুতির দিকেই ইঙ্গিত করে। কাদিয়ান ছিল একটি ছোট, অখ্যাত গ্রাম। সেখান থেকে একটি বিশ্বব্যাপী জামাতের সূচনা হওয়াই প্রমাণ করে, আল্লাহর সাহায্য সত্যিই সেখানে নেমে এসেছিল।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই ইলহামে নতুন বা অদ্ভুত কিছু নেই। কুরআন ও সহীহ হাদীস আল্লাহর “নেমে আসা” ও “আগমন”-এর যে ভাষা ব্যবহার করেছে, ইলহামেও সেই ভাষা। অর্থও একই: আল্লাহর রহমত, সাহায্য ও নিদর্শনের প্রকাশ। যাঁরা প্রতি রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর নেমে আসার হাদীসে বিশ্বাস রাখেন, তাঁদের কাছে এই ইলহামের অর্থ বোঝা মোটেই কঠিন হওয়ার কথা নয়। একই শব্দ এক জায়গায় ঈমানের অংশ, আর অন্য জায়গায় আপত্তির কারণ, এমন হতে পারে না। ন্যায়বিচারের দাবি হলো, দুই জায়গাতেই একই অর্থ নেওয়া।

সংক্ষেপে

  1. সহীহ বুখারীর হাদীস অনুযায়ী আল্লাহ প্রতি রাতে নিকটতম আকাশে নেমে আসেন (হাদীস ১১৪৫); এর অর্থ রহমত ও নৈকট্যের প্রকাশ।
  2. কুরআনেও আল্লাহর “আগমন”-এর কথা আছে (৮৯:২৩, ২:২১১), যার অর্থ তাঁর নিদর্শন ও সিদ্ধান্তের প্রকাশ।
  3. সহীহ মুসলিম অনুযায়ী আগমনকারী মসীহের প্রতি আল্লাহ ওহী করবেন; তাই তাঁর কাছে আল্লাহর নিদর্শন নেমে আসা প্রতিশ্রুতিরই পূর্ণতা।
  4. যে শব্দ হাদীসে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, ইলহামে সেটিকে আপত্তিকর বলা দ্বিমুখী মাপকাঠি।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.