একটি পুরোনো বাগান অনেক দিন অযত্নে পড়ে ছিল। গোলাপ, জুঁই, বেলি, সব গাছ শুকিয়ে যাচ্ছিল। তারপর একজন মালী এলেন। পানি দিলেন, আগাছা তুললেন। কিছুদিন পর সব গাছে আবার ফুল ফুটল।
কেউ যদি বলে, “মালীর আসায় বাগানের সব গাছ জীবন ফিরে পেল”, তাতে কি মালী গাছগুলোর চেয়ে বড় হয়ে গেলেন? না। তিনি শুধু সেগুলোর সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিলেন। আজকের কবিতার পঙক্তিটিও এভাবে পড়তে হয়।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নুযূলুল মসীহ (রূহানী খাযায়েন ১৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৮) থেকে একটি ফারসি কবিতার অনুবাদ দেখানো হয়: “আমার আগমনের দ্বারা প্রত্যেক নবী জীবন ফিরে পেয়েছেন, আর সমস্ত রসূল আমার জামার মধ্যে গোপন হয়ে আছেন।” বলা হয়, এতে তিনি সব নবীর ওপরে নিজেকে স্থান দিয়েছেন।
“নবীদের পোশাকে আল্লাহর বীর”
এই কবিতার ভাব বুঝতে হলে হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর একটি ইলহাম জানা দরকার: “জারিউল্লাহি ফী হুলালিল আম্বিয়া”, অর্থাৎ নবীদের পোশাকে আল্লাহর বীর। “সব রসূল আমার জামার ভেতরে” কথাটি একই ভাবের প্রকাশ: নবীদের পোশাক, নবীদের গুণ।
এর অর্থ কী, তা তিনি নিজেই বলে গেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা: “এই ইলহামের অর্থ হলো, আমাকে সব নবীর বিশেষ অবস্থা বা বিশেষ গুণাবলির কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে।” (বারাহীনে আহমদীয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৯)
লক্ষ করুন, “কিছু অংশ”। সব নবীর সব মর্যাদা নয়, তাঁদের সমান হওয়াও নয়। প্রত্যেক নবীর জীবনের কোনো না কোনো দিকের ছাপ তাঁর জীবনে পড়েছে, এটুকুই।
কেন এমন একজনের প্রয়োজন?
কিশতিয়ে নূহ-এ তিনি এর যুক্তি দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীস বলে, এই উম্মতের অনেকে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মন্দ অভ্যাস গ্রহণ করবে। তাহলে আল্লাহর রহমতের দাবি হলো, এই উম্মতের কেউ সেই জাতিগুলোর পুণ্যবানদের উত্তরাধিকারও পাবে। তাঁর ভাষায়: এই উম্মত থেকে কি এমন কারো আসা জরুরি নয়, যিনি বনী ইসরাঈলের সব নবীর উত্তরাধিকারী ও প্রতিচ্ছবি হবেন?
আর এই উত্তরাধিকার আসে কোন পথে? মহানবী (সা.)-এর পথে। কারণ কুরআন মহানবী (সা.)-কে আগের সব নবীর হেদায়াত অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে:
অর্থাৎ আগের সব নবীর গুণ মহানবী (সা.)-এর মধ্যে একত্র হয়েছে। তাঁর পূর্ণ অনুসারী তাঁর কাছ থেকেই সেই গুণের অংশ পান। জামার ভেতরে যা কিছু, তা মূলত মহানবী (সা.)-এর ভাণ্ডার থেকে।
“প্রত্যেক নবী জীবন ফিরে পেয়েছেন” মানে কী?
তাঁর যুগে অনেক নবীর নামে কলঙ্ক লেপন করা হচ্ছিল। কেউ ঈসা (আ.)-কে অভিশপ্ত মৃত্যুর অভিযোগে অভিযুক্ত করছিল, কেউ তাঁকে খোদা বানাচ্ছিল। তিনি কুরআনের আলোয় প্রমাণ করেছেন, ঈসা (আ.) ছিলেন আল্লাহর সম্মানিত রসূল, অভিশপ্তও নন, খোদাও নন। এভাবে নবীদের প্রকৃত মর্যাদা নতুন করে মানুষের সামনে এসেছে। একেই কবিতায় বলা হয়েছে “জীবন ফিরে পাওয়া”।
আর তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, নবীদের সত্যতার স্বীকৃতির আসল কৃতিত্ব মহানবী (সা.)-এর। ইতমামুল হুজ্জত-এ তিনি লিখেছেন: এই মহান নবী পৃথিবীতে না এলে ইউনুস, আইয়ুব, ঈসা ইবনে মরিয়ম, মালাখি, ইয়াহইয়া, যাকারিয়া প্রমুখ নবীর সত্যতা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতাম না, আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ থাকত না (ইতমামুল হুজ্জত, পৃষ্ঠা ২৮)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এটি কি সব নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নয়?
না। তিনি নিজেই বলেছেন “কিছু অংশ”। কুরআন বলে, আল্লাহ রসূলদের কাউকে কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৪), আর সবার ওপরে মহানবী (সা.)। একটি আয়না যদি অনেক ফুলের ছবি একসাথে ধরে, তাতে আয়না ফুলের বাগান হয়ে যায় না। আর আয়না যে আলোয় ছবি দেখায়, সেই আলো এখানে মহানবী (সা.)-এর।
কবিতার ভাষা কি আক্ষরিক অর্থে নিতে হবে?
কবিতা উপমা আর রূপকের ভাষা। “জামার ভেতরে গোপন” মানে কেউ আক্ষরিকভাবে জামার ভেতরে লুকিয়ে আছেন, এমন অর্থ কেউ করে না। এর অর্থ তিনি নিজেই গদ্যে দিয়ে গেছেন: সব নবীর গুণাবলির কিছু অংশ। কবিতা বোঝার সঠিক পথ হলো কবির নিজের গদ্য ব্যাখ্যা দেখা।
নবীদের প্রতি তাঁর মনোভাব আসলে কেমন ছিল?
কুরআন মু’মিনদের শেখায়, “আমরা তাঁহার রসূলগণের কাহারও মধ্যে কোন পার্থক্য করি না” (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬), অর্থাৎ সবার ওপর সমানভাবে ঈমান রাখি। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর লেখা ভরা আছে নবীদের পবিত্রতার পক্ষে যুক্তিতে; উপরের ইতমামুল হুজ্জতের উদ্ধৃতি তার একটি নমুনা, যেখানে তিনি এই নবীদের বলেছেন আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ও প্রিয়ভাজন।
সব নবীর সাথে মহানবী (সা.)-এর সম্পর্ক কী?
কুরআন জানায়, আল্লাহ নবীদের মাধ্যমে একটি অঙ্গীকার নিয়েছিলেন: তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়ন করে এমন এক রসূল এলে তোমরা তাঁর ওপর ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে (সূরা আলে ইমরান ৩:৮২)। অর্থাৎ আগের নবীদের সিলসিলা গিয়ে মিশেছে মহানবী (সা.)-এর সিলসিলায়।
এ কারণেই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সব নবীর গুণের যে অংশ পাওয়ার কথা বলেছেন, তা পেয়েছেন মহানবী (সা.)-এর দরজা দিয়ে। সাগরে সব নদী এসে মেশে; যে সাগর থেকে পানি তোলে, সে সব নদীর পানিই পায়। কিন্তু কৃতিত্ব সাগরের, পানি তোলার পাত্রের নয়।
সব মিলিয়ে: কবিতার পঙক্তিটি তাঁর ইলহাম “জারিউল্লাহি ফী হুলালিল আম্বিয়া”-র ভাবেরই প্রকাশ, আর সেই ইলহামের অর্থ তিনি নিজেই বলে গেছেন: সব নবীর গুণের কিছু অংশ, মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের পথে। মালী বাগানে ফুল ফোটান, কিন্তু বাগানের মালিক অন্যজন।
সংক্ষেপে
- পঙক্তিটির ভাব “জারিউল্লাহি ফী হুলালিল আম্বিয়া” (নবীদের পোশাকে আল্লাহর বীর) ইলহামের সাথে মিলে যায়।
- তাঁর নিজের ব্যাখ্যা: সব নবীর বিশেষ গুণাবলির “কিছু অংশ” তাঁকে দেওয়া হয়েছে (বারাহীনে আহমদীয়া ৫ম খণ্ড, পৃ. ৮৯)।
- আগের নবীদের হেদায়াত মহানবী (সা.)-এর মধ্যে একত্র (৬:৯১); তাঁর অনুসারী সেখান থেকেই অংশ পান।
- “নবীরা জীবন ফিরে পেলেন” মানে তাঁদের মর্যাদা থেকে কলঙ্ক দূর হওয়া; আর তিনি নিজে বলেছেন, নবীদের সত্যতার প্রমাণ মহানবী (সা.)-এর অনুগ্রহ।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Reflection of all the Prophets · alislam.org
- The Promised Messiah’s Beliefs · alislam.org
- Noah’s Ark (Kashti-e-Nuh), English PDF · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.