আকাশের গ্রহণ, শতাব্দীর সংস্কারক আর এক যমজ জন্ম: হাদীস ও বুযুর্গদের চিহ্নগুলো কার দিকে ইঙ্গিত করে?

মহানবী (সা.) আর উম্মতের বুযুর্গরা শেষ যুগের মাহদীর কিছু চিহ্ন বলে গেছেন, যেগুলো কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছায় পূর্ণ করতে পারে না। সেই চিহ্নগুলো একে একে মিলিয়ে দেখা যাক।

৯ মিনিটে পড়ুন9 min read · in Bangla

১৮৯৪ সালের ২১ মার্চ। রমযান মাস, ১৩ তারিখের সন্ধ্যা। কাদিয়ানের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। হঠাৎ চাঁদের গায়ে ছায়া নামতে শুরু করল: চন্দ্রগ্রহণ।

দুই সপ্তাহের কিছু বেশি পর, ৬ এপ্রিল, শুক্রবার সকাল। একই রমযানের ২৮ তারিখ। এবার সূর্যের গায়ে ছায়া: সূর্যগ্রহণ। ভারতবর্ষসহ এশিয়ার বিশাল অঞ্চল থেকে তা দেখা গেল।

গ্রহণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই দুটি গ্রহণের সাথে জড়িয়ে ছিল তেরোশ বছরের পুরোনো একটি ভবিষ্যদ্বাণী, আর একজন জীবিত দাবিদার।

প্রথম চিহ্ন: রমযানের দুটি গ্রহণ

হাদীসের প্রসিদ্ধ সংকলক ইমাম দারাকুতনী (রহ.) হযরত ইমাম মুহাম্মদ বাকির (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন:

“আমাদের মাহদীর জন্য দুটি নিদর্শন আছে, যা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে কখনো ঘটেনি: রমযানে চন্দ্রগ্রহণ হবে তার প্রথম রাতে, আর সূর্যগ্রহণ হবে তার মধ্যভাগে।”
সুনানে দারাকুতনী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৮

প্রকৃতির নিয়মে চন্দ্রগ্রহণ হয় কেবল চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ বা ১৫ তারিখে, আর সূর্যগ্রহণ ২৭, ২৮ বা ২৯ তারিখে। তাই “প্রথম রাত” মানে চন্দ্রগ্রহণের সম্ভাব্য রাতগুলোর প্রথমটি, অর্থাৎ ১৩ তারিখ; আর “মধ্যভাগ” মানে সূর্যগ্রহণের সম্ভাব্য দিনগুলোর মাঝেরটি, অর্থাৎ ২৮ তারিখ। মজার কথা, নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (রহ.)-ও তাঁর হুজাজুল কিরামাহ-তে এই তারিখগুলোর কথা লিখেছেন।

১৮৯৪ সালে ঠিক তা-ই ঘটল: ১৩ রমযান ১৩১১ হিজরীতে চন্দ্রগ্রহণ, ২৮ রমযানে সূর্যগ্রহণ। আর সে সময় একজন মানুষ জীবিত ছিলেন, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে মাহদী হওয়ার দাবি করছিলেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এ নিয়ে নূরুল হক দ্বিতীয় খণ্ড লেখেন এবং ঘোষণা করেন, এই গ্রহণ তাঁর দাবির পক্ষে আল্লাহর নিদর্শন।

কুরআনেও শেষ যুগের চিহ্ন হিসেবে চাঁদ ও সূর্যের গ্রহণের কথা আছে:

وَخَسَفَ الۡقَمَرُ ۙ وَجُمِعَ الشَّمۡسُ وَالۡقَمَرُ
“এবং চন্দ্রে গ্রহণ লাগিবে, এবং সূর্য এবং চন্দ্র উভয়কে (গ্রহণে) একত্রিত করা হইবে,”
সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:৯–১০
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৭৫:৮–৯।

দ্বিতীয় চিহ্ন: শতাব্দীর শিরোভাগের সংস্কারক

মহানবী (সা.) বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِائَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا
“নিশ্চয় আল্লাহ এই উম্মতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর শিরোভাগে এমন ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে নতুন করে সজীব করবেন।”
সুনানে আবু দাউদ, কিতাবুল মালাহিম, হাদীস ৪২৯১

উম্মতের আলেমরা তেরো শতাব্দী পর্যন্ত প্রতিটি শতাব্দীর মুজাদ্দিদের তালিকা করেছেন। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের দাবি নিয়ে যিনি দাঁড়ালেন, তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন: যদি আমি সত্য না হই, তাহলে এই শতাব্দীর শুরুতে আর কে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুজাদ্দিদ হওয়ার দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছে?

✦

তৃতীয় চিহ্ন: বুযুর্গদের কাশফ

মহান সুফি সাধক শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী (রহ.) তাঁর ফুসূসুল হিকাম-এ শেষ যুগের “খাতামুল আউলিয়া” সম্পর্কে লিখেছেন: তাঁর সাথে একটি বোন জন্ম নেবে, যে তাঁর আগে ভূমিষ্ঠ হবে, আর তিনি জন্মাবেন তার পরে; তাঁর বংশ হবে চীনা অঞ্চলের।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, ঠিক এভাবেই তাঁর জন্ম হয়েছিল। তিনি শুক্রবার সকালে যমজ হয়ে জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর আগে জন্ম নেয় একটি মেয়ে, যার নাম রাখা হয়েছিল জান্নাত, আর কয়েক দিন পর সে মারা যায় (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২০৯)। তাঁর পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন সমরকন্দ থেকে, যা চীনের সাথে যুক্ত অঞ্চল। তিনি আরও লিখেছেন, গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা সবাই এই যমজ জন্মের কথা জানতেন, আর তাঁর কাছে ধাত্রীর লিখিত সাক্ষ্যও ছিল (তিরয়াকুল কুলূব, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৪৮১–৪৮৬)।

এর বাইরেও বুযুর্গদের লেখায় আরও চিহ্ন আছে। যেমন, শেখ আলী হামযা আত-তূসী (রহ.)-এর জাওয়াহিরুল আসরার-এ বলা হয়েছে, মাহদী এমন একটি গ্রাম থেকে আবির্ভূত হবেন, যার নাম “কাদআ”। আর হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) একটি খুতবায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন, মসীহ ও মাহদীর যুগে যে “যুস-সিনীন” নক্ষত্রের (ধূমকেতু) উদয়ের কথা ছিল, ১৮৮২ সালের মহা ধূমকেতুর রূপে হাজারো মানুষ তা দেখেছে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“দারাকুতনীর হাদীসটির সনদ তো দুর্বল”

এখানে কেউ কেউ বলেন, বর্ণনাকারীদের কারণে হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয়। alislam.org-এর উত্তরটি সহজ: যে ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়ে গেছে, তার বর্ণনাকারীদের নিয়ে সন্দেহ আর অর্থ বহন করে না। কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছায় রমযানের নির্দিষ্ট তারিখে গ্রহণ ঘটাতে পারে না। তা ছাড়া একই কথা আল্লামা শিহাবুদ্দীন ইবনে হাজার (রহ.)-এর আল-ফাতাওয়াল হাদীসিয়্যা-তেও মুহাম্মদ ইবনে আলীর সূত্রে এসেছে, আর এর মূল কুরআনের সূরা কিয়ামাহতেই আছে। ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতাই এর সত্যতার সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

“রমযানে ১৩ ও ২৮ তারিখে গ্রহণ তো আগেও হয়েছে”

হ্যাঁ, হয়েছে। কিন্তু হাদীসের মূল কথা গ্রহণটি নয়, গ্রহণটি “আমাদের মাহদীর জন্য” নিদর্শন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, হাদীসের উদ্দেশ্য কোনো অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়, বরং মাহদীকে চেনার এমন একটি মাপকাঠি দেওয়া, যা অন্য কারো মধ্যে নেই। ইতিহাসে আর কখনো এমন হয়নি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে মাহদী হওয়ার দাবিদার একজন জীবিত আছেন, আর ঠিক তখন তাঁর দেশের আকাশে এই দুটি গ্রহণ দেখা গেছে। তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন: এমন আরেকজন মাহদী দাবিদার দেখাও, যাঁর জন্য এই নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে।

“বুযুর্গদের কাশফ কি দলিল হতে পারে?”

বুযুর্গদের কাশফ কুরআন-হাদীসের সমান দলিল নয়, আর আমরা তা দাবিও করি না। মূল দলিল কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর হাদীস। কিন্তু যখন শত শত বছর আগের একজন বুযুর্গের লেখা চিহ্ন, যেমন যমজ জন্ম, একজন দাবিদারের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়, তখন তা একটি অতিরিক্ত সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এটি এমন চিহ্ন, যা কেউ নিজে সাজাতে পারে না: কেউ নিজের জন্মের ধরন ঠিক করে আসে না।

সংক্ষেপে

  1. দারাকুতনীর বর্ণনা অনুযায়ী মাহদীর নিদর্শন রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ; ১৮৯৪ সালের ১৩ ও ২৮ রমযান তা ঘটেছে, যখন মাহদী দাবিদার জীবিত ছিলেন।
  2. আবু দাউদের হাদীস (৪২৯১) অনুযায়ী প্রতি শতাব্দীর শুরুতে মুজাদ্দিদ আসেন; চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে দাবিদার তিনিই।
  3. ইবনে আরাবী (রহ.) লিখেছেন, শেষ যুগের খলীফা যমজ হয়ে জন্মাবেন, আগে একটি বোন; হযরত মির্যা সাহেবের জন্ম ঠিক এভাবেই হয়েছে।
  4. এই চিহ্নগুলো মানুষের সাধ্যের বাইরে; একসাথে মিলে এগুলো তাঁর সত্যতার সাক্ষ্য দেয়।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.