একটি পুরোনো বাড়ির কথা ভাবুন। যত মজবুত করেই বানানো হোক, বছরের পর বছর ধুলো জমে, দেয়ালে শ্যাওলা ধরে। মাঝে মাঝে কাউকে এসে ধুলো ঝেড়ে, রং করে বাড়িটাকে আবার ঝকঝকে করে তুলতে হয়।
ধর্মের বেলাতেও এমনটা ঘটে। কুরআন বদলায় না, কিন্তু মানুষের বোঝা আর আমলে সময়ের সঙ্গে ভুল আর কুসংস্কার জমে যায়। আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে এ অবস্থায় একা ফেলে রাখেননি। তিনি আগেই কথা দিয়েছেন যে, এই কিতাবের হেফাযত তিনি নিজেই করবেন।
এই হেফাযত শুধু কাগজের পাতায় অক্ষর বাঁচিয়ে রাখা নয়। কুরআনের সঠিক অর্থ আর জীবন্ত আমলও বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এর জন্য আল্লাহ কী ব্যবস্থা রেখেছেন, তা মহানবী (সা.) স্পষ্ট করে বলে গেছেন।
প্রতি শতাব্দীর মাথায় একজন
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
যিনি দ্বীনকে নতুন করে সজীব করেন, তাঁকে বলা হয় মুজাদ্দিদ, অর্থাৎ সংস্কারক। তিনি নতুন ধর্ম আনেন না। তিনি পুরোনো ধর্মের ওপর জমে থাকা ধুলো সরিয়ে আসল চেহারাটা আবার দেখান।
হাদীসটির শব্দগুলো খেয়াল করুন: “প্রতি একশত বছরের মাথায়”। অর্থাৎ এটি কোনো এককালীন ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর একটি স্থায়ী নিয়ম। যতদিন এই উম্মত থাকবে, ততদিন এই ধারা চলবে।
তেরো শতাব্দীর সংস্কারকেরা
মুসলিম আলেমরা যুগে যুগে তালিকা বানিয়েছেন, কোন শতাব্দীতে কে মুজাদ্দিদ ছিলেন। আহলে হাদীস আলেম নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান (রহ.)-এর হিজাজুল কিরামা গ্রন্থের ভাষ্য অনুযায়ী প্রণীত একটি তালিকা খুব পরিচিত। এতে এমন সব নাম আছে, যাঁদের প্রায় সব মুসলমান শ্রদ্ধা করেন:
প্রথম শতাব্দীতে হযরত ওমর বিন আবদুল আযীয (রহ.)। দ্বিতীয় শতাব্দীতে হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)। তৃতীয় শতাব্দীতে হযরত আবুল হাসান আশআরী (রহ.)। চতুর্থ শতাব্দীতে কাজী আবু বকর বাকিল্লানী (রহ.)।
পঞ্চম শতাব্দীতে হযরত ইমাম গাযযালী (রহ.)। ষষ্ঠ শতাব্দীতে হযরত সৈয়দ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)। সপ্তম শতাব্দীতে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)। অষ্টম শতাব্দীতে হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহ.)। নবম শতাব্দীতে ইমাম সুয়ূতী (রহ.)।
দশম শতাব্দীতে মুহাম্মদ তাহির গুজরাটি (রহ.)। একাদশ শতাব্দীতে মুজাদ্দিদে আলফে সানী শেখ আহমদ সারহিন্দী (রহ.)। দ্বাদশ শতাব্দীতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.)। আর ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.)।
তালিকাটি পড়লে একটা জিনিস চোখে পড়ে। মহানবী (সা.)-এর প্রতিশ্রুতি এক শতাব্দীও ফাঁকা যায়নি। প্রতিটি অন্ধকার সময়ে আল্লাহ কাউকে না কাউকে দাঁড় করিয়েছেন।
তাহলে চৌদ্দতম শতাব্দী?
তালিকাটি থেমে আছে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। এরপর এল হিজরী চৌদ্দতম শতাব্দী, যা শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে। এটি ছিল মুসলমানদের জন্য খুব কঠিন সময়। রাজনৈতিক শক্তি হাতছাড়া, বাইরে থেকে খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রবল আক্রমণ, আর ভেতরে মতভেদ আর বিভক্তি।
সে যুগের আলেমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁরা জানতেন, এই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ সাধারণ কেউ হবেন না। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান লিখেছিলেন, চৌদ্দতম শতাব্দীর মাথায়, যার আসতে তখনও দশ বছর বাকি, যদি মাহদী ও ঈসা (আ.)-এর আগমন ঘটে, তাহলে তাঁরাই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ (হিজাজুল কিরামা, পৃষ্ঠা ১৩৫–১৩৯)।
ঠিক এই সময়ে কাদিয়ানের হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঘোষণা দিলেন। তিনি লিখেছেন, ত্রয়োদশ শতাব্দী যখন শেষ হয়ে আসছিল আর চৌদ্দতম শতাব্দী শুরু হতে যাচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাআলা ইলহামের মাধ্যমে তাঁকে জানালেন যে তিনিই চৌদ্দতম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ (কিতাবুল বারিয়্যা, পৃষ্ঠা ২০১)।
পরে আল্লাহর নির্দেশে তিনি আরও জানালেন, যে মসীহ ও মাহদীর অপেক্ষায় উম্মত বসে আছে, তিনিই সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি। অর্থাৎ আলেমরা যে আশা করেছিলেন, চৌদ্দতম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আর প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী একই ব্যক্তি হবেন, তা-ই বাস্তবে ঘটেছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মুজাদ্দিদদের তালিকা তো সর্বসম্মত নয়, তাহলে এর ওপর ভরসা কেন?”
কথাটি ঠিক, বিভিন্ন আলেম বিভিন্ন তালিকা দিয়েছেন। কোনো শতাব্দীতে একাধিক নামও এসেছে। কিন্তু চলুন দেখি, আমাদের যুক্তি কি তালিকার প্রতিটি নামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে?
না। আসল ভিত্তি হলো আবু দাউদের হাদীস: প্রতি শতাব্দীর মাথায় একজন সংস্কারক আসবেন। তালিকা শুধু দেখায় যে উম্মত এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছে এবং প্রতি যুগে তা পূর্ণ হতে দেখেছে। নামের তালিকা নিয়ে মতভেদ থাকলেও প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।
“চৌদ্দতম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ অন্য কেউও তো হতে পারেন?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, চৌদ্দতম শতাব্দীতে আরও অনেক বড় আলেম ছিলেন। তাঁদের সম্মান আমরা স্বীকার করি। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, শতাব্দীর মাথায় দাঁড়িয়ে কে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হওয়ার দাবি করেছিলেন, আর কার দাবি সেই যুগের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলে যায়?
সে যুগের আলেমরা নিজেরাই বলেছিলেন, এই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হবেন মসীহ ও মাহদী। আর মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি নিয়ে ঠিক শতাব্দীর মাথায় দাঁড়িয়েছিলেন একজনই, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। তাঁর কলম খ্রিষ্টান মিশনারিদের আক্রমণের জবাব দিয়েছে, আর তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামাত আজ বিশ্বজুড়ে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিচ্ছে।
“মুজাদ্দিদ আর মসীহ তো আলাদা পদ, একজন একসঙ্গে দুটি হন কীভাবে?”
এই প্রশ্নের উত্তরও আলেমদের কথাতেই আছে। নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান নিজেই লিখেছেন, চৌদ্দতম শতাব্দীতে মাহদী ও ঈসা (আ.)-এর আগমন ঘটলে তাঁরাই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। অর্থাৎ যিনি মসীহ, তিনি সংস্কারকও। বড় দায়িত্বের ভেতরে ছোট দায়িত্ব এমনিই ঢুকে থাকে।
তাই প্রশ্নটা আসলে উল্টো দিকে ঘোরে: যদি চৌদ্দতম শতাব্দীর মাথায় প্রতিশ্রুত মসীহ না এসে থাকেন, তাহলে সেই আলেমদের প্রত্যাশা আর মহানবী (সা.)-এর প্রতিশ্রুতির কী হলো? উত্তর একটাই: তিনি এসেছেন, সময়মতো এসেছেন।
সংক্ষেপে
- মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতি শতাব্দীর মাথায় আল্লাহ একজন মুজাদ্দিদ পাঠাবেন (আবু দাউদ, হাদীস ৪২৯১)।
- প্রথম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত উম্মত বহু সংস্কারককে এই প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা হিসেবে মেনে নিয়েছে।
- সে যুগের আলেমরাই আশা করেছিলেন, চৌদ্দতম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হবেন প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী।
- ঠিক সেই শতাব্দীর মাথায় হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) আল্লাহর নির্দেশে মুজাদ্দিদ এবং পরে মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Conclusion of the 14th Century and A Moment of Reflection for the Muslims · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.