পুলিশ যখন কাউকে খোঁজে, তারা একটি বর্ণনা ছাপে: গায়ের রং কেমন, চুল কেমন, উচ্চতা কত। এখন ধরুন, একই মানুষের জন্য দুটি বর্ণনা ছাপা হলো। একটিতে লেখা গায়ের রং লালচে, চুল কোঁকড়া। আরেকটিতে লেখা গায়ের রং বাদামি, চুল একদম সোজা। আপনি কী ভাববেন?
স্বাভাবিকভাবেই ভাববেন, এরা দুজন আলাদা মানুষ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সহীহ বুখারীতে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। মহানবী (সা.) “ঈসা”র চেহারা বর্ণনা করেছেন দুইভাবে, আর দুটি বর্ণনা একে অন্যের থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা।
প্রথম বর্ণনা: অতীতের নবী
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
খেয়াল করুন, এখানে ঈসা (আ.)-কে দেখানো হয়েছে অতীতের অন্য নবীদের পাশে: মূসা (আ.) ও ইবরাহীম (আ.)। এটি বনী ইসরাঈলের নবী ঈসা (আ.)-এর বর্ণনা, যিনি প্রায় দুই হাজার বছর আগে এসেছিলেন।
দ্বিতীয় বর্ণনা: কাবার পাশে, দাজ্জালের মুখোমুখি
এবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর বর্ণনা। মহানবী (সা.) বলেছেন:
এই একই স্বপ্নে মহানবী (সা.) এরপর দাজ্জালকেও দেখলেন: ভারী দেহ, লালচে রং, কোঁকড়া চুল, এক চোখ কানা। দাজ্জাল শেষ যুগের ফিতনা। তাই এই দৃশ্যে যে “ইবনে মারইয়াম” দাজ্জালের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি শেষ যুগে আগমনকারী মসীহ।
এবার দুটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখুন। অতীতের ঈসা: লালচে বর্ণ, কোঁকড়া চুল। আগমনকারী মসীহ: বাদামি বর্ণ, সোজা চুল। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত হুযূর আনোয়ার (আই.)-এর ২০১৩ সালের ২২ মার্চের খুতবার সারাংশেও ঠিক এই পার্থক্যটি তুলে ধরা হয়েছে: আগমনকারী মসীহ হালকা বাদামি বর্ণ আর সোজা চুলের, আর ইসরাঈলী মসীহ লালচে বর্ণ আর কোঁকড়া চুলের।
একজন সাহাবীর শপথ
এই পার্থক্য সাহাবীদের যুগেই মানুষের চোখে পড়েছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর ছেলে সালিম (রহ.) তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন:
অর্থাৎ হযরত ইবনে উমর (রা.) যে বর্ণনা শুনেছিলেন, তাতে ঈসার রং লালচে নয়। আর হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) যে বর্ণনা শুনেছিলেন, তাতে লালচে। দুজনই সত্যবাদী সাহাবী। দুটি বর্ণনাই বুখারীতে আছে। সমাধান একটাই: দুটি বর্ণনা দুজন আলাদা মানুষের।
এবার ইমাম মাহদীর একটি বর্ণনাও দেখা যাক। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন, মাহদী হবেন প্রশস্ত ললাট আর উন্নত নাকের অধিকারী (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৫)।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের বর্ণনা সংরক্ষিত আছে। সীরাতুল মাহদী গ্রন্থে (২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৩) লেখা আছে, তাঁর চুল ছিল সোজা, উজ্জ্বল ও নরম, ঘাড় পর্যন্ত লম্বা। আগমনকারী মসীহর যে চেহারা মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেছিলেন, তার সঙ্গে এটি মিলে যায়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“একই মানুষকে দুই সময়ে দুই রকম দেখা যেতেই পারে।”
এখানে কেউ কেউ বলেন, রোদে পুড়ে রং বদলায়, চুলও আঁচড়ালে সোজা দেখায়। চলুন দেখি। প্রথমত, কোঁকড়া আর সোজা চুল দুটি বিপরীত বৈশিষ্ট্য, আর মহানবী (সা.) বর্ণনা দিচ্ছিলেন যেন মানুষ চিনতে পারে। চেনানোর বর্ণনা যদি বিপরীত হয়, তাহলে চেনানোর উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়।
দ্বিতীয়ত, হযরত ইবনে উমর (রা.) শপথ করে বলেছেন, ঈসার রং লালচে বলা হয়নি। একজন সাহাবী যখন আল্লাহর কসম খেয়ে একটি পার্থক্যের কথা বলেন, তখন বোঝা যায় তিনি পার্থক্যটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন, সামান্য রোদে-পোড়া রং নয়।
“মির্যা সাহেব তো কখনো কাবা তাওয়াফ করেননি, তাহলে এই হাদীস তাঁর ওপর খাটে কীভাবে?”
হাদীসের প্রথম শব্দগুলোই উত্তর দেয়: “বাইনা আনা নাইমুন”, অর্থাৎ “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম”। এটি একটি স্বপ্ন, আর স্বপ্নের ভাষা ব্যাখ্যা দাবি করে। একই স্বপ্নের আরেকটি বর্ণনায় আছে, দাজ্জালও কাবা তাওয়াফ করছিল (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪০)।
অথচ সহীহ বুখারীতেই মহানবী (সা.) বলেছেন, মক্কা আর মদীনা ছাড়া এমন কোনো শহর নেই যেখানে দাজ্জাল পা রাখবে না (হাদীস ১৮৮১)। দাজ্জাল মক্কায় ঢুকতেই পারবে না, তাহলে সে কাবা তাওয়াফ করবে কীভাবে? বোঝা যায়, এই তাওয়াফ আক্ষরিক নয়। দুজনেরই লক্ষ্য ইসলামের কেন্দ্র: একজন তাকে রক্ষা করতে, অন্যজন তাকে আক্রমণ করতে।
“চেহারার মিল দিয়ে কি কারো সত্যতা প্রমাণ হয়?”
না, শুধু চেহারা দিয়ে নয়, আর আমরা তা দাবিও করি না। চেহারার বর্ণনার আসল শিক্ষা অন্য জায়গায়: বুখারী নিজেই দেখাচ্ছে যে আগমনকারী মসীহ আর ইসরাঈলী নবী ঈসা (আ.) দুজন আলাদা মানুষ। এই একটি কথাই আকাশ থেকে পুরোনো ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আর আগমনকারীর সত্যতা প্রমাণ হয় তাঁর দাবি, তাঁর সময়, তাঁর কাজ আর আল্লাহর সাহায্য দিয়ে।
সংক্ষেপে
- বুখারী ৩৪৩৮-এ অতীতের নবী ঈসা (আ.) লালচে বর্ণ, কোঁকড়া চুল ও চওড়া বুকের।
- বুখারী ৭১২৮-এ দাজ্জালের মুখোমুখি আগমনকারী “ইবনে মারইয়াম” বাদামি বর্ণ ও সোজা চুলের।
- হযরত ইবনে উমর (রা.) শপথ করে বলেছেন, নবী (সা.) ঈসাকে “লালচে” বলেননি (বুখারী ৩৪৪১); তাই এঁরা দুজন আলাদা মানুষ।
- প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর চুল ছিল সোজা ও নরম, যা আগমনকারী মসীহর বর্ণনার সঙ্গে মেলে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Friday Sermon summary, 22 March 2013 · alislam.org
- Misguided critique of Hazrat Mirza Ghulam Ahmad’s appearance · alhakam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.