নামাযে দুই সিজদার মাঝখানে বসে আমরা অনেকেই একটি ছোট্ট দোয়া পড়ি। দোয়াটি মহানবী (সা.) নিজে পড়তেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাতের নামাযে দুই সিজদার মাঝে তিনি বলতেন:
শেষ শব্দটি লক্ষ করুন: ওয়ারফা’নী, “আমাকে রাফা দাও”। কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিন এই দোয়া পড়েন। কিন্তু কেউ কি তখন চান যে আল্লাহ তাঁকে সশরীরে আকাশে তুলে নিন? অবশ্যই না। সবাই বোঝেন, এখানে চাওয়া হচ্ছে মর্যাদা আর আধ্যাত্মিক উন্নতি।
অথচ ঈসা (আ.)-এর বেলায় এসে এই একই শব্দের অর্থ বদলে ফেলা হয়। তাই চলুন দেখি, কুরআন আর হাদীস এই শব্দটি কীভাবে ব্যবহার করেছে।
কুরআনে “রাফা”
প্রথমে এমন এক ব্যক্তির কথা, যাকে আল্লাহ তাঁর নিদর্শন দিয়েছিলেন, কিন্তু সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল:
এখানে “রাফা”-র বিপরীতে রাখা হয়েছে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া আর কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ। alislam.org-এর প্রবন্ধ তাই মন্তব্য করেছে: এই তুলনা তখনই অর্থবহ, যখন রাফা মানে আধ্যাত্মিক উন্নতি। দেহকে ওপরে তোলার সাথে কুপ্রবৃত্তির তুলনা হয় না।
মুমিন আর জ্ঞানীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
কোনো আলেম কি বলবেন, জ্ঞানী মুমিনরা সশরীরে আকাশে উঠে যাবেন? নবীদের সম্পর্কেও একই কথা: “তাহাদের মধ্যে কতককে মর্যাদায় উন্নীত করিয়াছেন” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৪)। আর হযরত ইদ্রীস (আ.) সম্পর্কে: “এবং আমরা তাহাকে অতি উচ্চ মর্যদায় উন্নীত করিয়াছিলাম” (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৮)।
হাদীসে “রাফা”
মহানবী (সা.)-এর কথাতেও শব্দটি বারবার এসেছে, আর প্রতিবারই এর অর্থ সম্মান ও মর্যাদা।
হযরত উমর (রা.) মহানবী (সা.)-এর এই কথাটি বর্ণনা করেছেন: “আল্লাহ এই কিতাবের মাধ্যমে কিছু জাতিকে উন্নীত করেন আর অন্যদের নামিয়ে দেন” (সহীহ মুসলিম, কিতাবু সালাতিল মুসাফিরীন, হাদীস ৮১৭)। মক্কায় অসুস্থ হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.)-কে দেখতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছিলেন: “হয়তো আল্লাহ তোমাকে উন্নীত করবেন, তোমার দ্বারা কিছু মানুষ উপকৃত হবে আর কিছু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ওয়াসায়া, হাদীস ২৭৪২)। এরপর হযরত সা’দ (রা.) দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। কেউ বলেন না যে তাঁকে আকাশে তোলা হয়েছিল।
আরেকটি হাদীসে আল্লাহর কাজের বর্ণনা: তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন, দুঃখ দূর করেন, “এক জাতিকে উন্নীত করেন আর অন্যদের নামিয়ে দেন” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২০২)।
এবার একটি হাদীস, যেখানে “আকাশ” শব্দটিও আছে। alislam.org-এর প্রবন্ধে কানযুল উম্মাল (২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩)-এর বরাতে বলা হয়েছে: “বান্দা যখন বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে সপ্তম আকাশে উন্নীত করেন।” এখানে আকাশের কথা স্পষ্ট বলা থাকলেও কেউ বোঝেন না যে বিনয়ী মানুষ সশরীরে সপ্তম আকাশে চলে যান। অথচ ঈসা (আ.)-এর আয়াতে তো আকাশ শব্দটিই নেই।
একটি সহজ নিয়ম
এই সব উদাহরণ থেকে একটি নিয়ম বেরিয়ে আসে, যা alislam.org-এর প্রবন্ধে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে: যখন “রাফা” কাজটির কর্তা আল্লাহ আর কর্ম একজন মানুষ, তখন এর অর্থ সবসময় আধ্যাত্মিক উন্নতি, কখনো দেহকে ওপরে তোলা নয়।
কুরআনের আরেকটি আয়াত এই নিয়মটিকে আরও পরিষ্কার করে দেয়:
পবিত্র কথা আল্লাহর দিকে “ওঠে”, আর সৎকর্ম তাকে “রাফা” দেয়। কথা বা কাজের কোনো দেহ নেই, যা আকাশে উড়ে যাবে। এখানে ওঠা মানে আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া, মর্যাদা পাওয়া। alislam.org-এর প্রবন্ধে এই আয়াত দিয়েই দেখানো হয়েছে, আল্লাহর দিকে যা ওঠে তা পবিত্র আত্মা ও পবিত্র কাজ, দেহ নয়।
সূরা আন-নিসায় ঈসা (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, “বরং আল্লাহ্ তাহাকে তাঁহার দিকে উন্নীত করিয়াছেন” (৪:১৫৯)। কর্তা আল্লাহ, কর্ম একজন মানুষ। তাই অর্থও সেটাই, যা বাকি সব জায়গায়: আল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করেছেন, নিজের নৈকট্য দিয়েছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কুরআনেই তো আছে, ইউসুফ (আ.) তাঁর বাবা-মাকে সিংহাসনে “রাফা” করলেন। সেখানে তো শারীরিকভাবে ওপরে তোলা?
ঠিক কথা। সূরা ইউসুফে আছে: “এবং সে তাহার পিতা-মাতাকে উচ্চাসনে বসাইল” (১২:১০১)। কিন্তু লক্ষ করুন, এখানে কর্তা একজন মানুষ, ইউসুফ (আ.)। আর কোথায় তোলা হলো, সেই জায়গাটিও নাম ধরে বলা আছে: সিংহাসন। ঈসা (আ.)-এর আয়াতে কর্তা আল্লাহ, আর গন্তব্য কোনো জায়গা নয়, বরং “আল্লাহর দিকে”। ওপরের নিয়মটি ঠিক এই পার্থক্যই তুলে ধরে। একটি উদাহরণ দিয়ে অন্য প্রকারের বাক্যের অর্থ বদলানো যায় না।
ঈসা (আ.)-এর আয়াতে “ইলাইহি” (তাঁর দিকে) আছে, অন্য জায়গায় নেই। এতে কি অর্থ বদলায় না?
বদলায় না। alislam.org-এর প্রবন্ধে “তফসীরে সাফী” থেকে মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকাল বর্ণনার ভাষা তুলে ধরা হয়েছে: আল্লাহ তাঁর নবীকে ডাকলেন এবং রাফাআহু ইলাইহি, তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করলেন। হুবহু “ইলাইহি” সহ। আর মহানবী (সা.) মদিনায় সমাহিত। তা ছাড়া আল্লাহ সব জায়গায় আছেন; তাঁর “দিকে” ওঠা মানে কোনো স্থানে যাওয়া নয়, তাঁর নৈকট্য পাওয়া।
সংক্ষেপে
- নামাযে আমরা “ওয়ারফা’নী” বলে মর্যাদা চাই, আকাশে ওঠা নয়।
- কুরআনে আল্লাহ যখন কোনো মানুষকে “রাফা” দেন, অর্থ সবসময় মর্যাদা ও নৈকট্য (৭:১৭৭, ৫৮:১২, ১৯:৫৮)।
- তিরমিযী, মুসলিম, বুখারী ও ইবনে মাজাহর হাদীসেও শব্দটি একই অর্থে এসেছে।
- তাই “আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন” মানে ঈসা (আ.)-এর আধ্যাত্মিক সম্মান, দেহসহ আকাশে যাওয়া নয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- Holy Quran 4:159 (with commentary) · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.