চায়ের দোকানে আলোচনা জমে উঠেছে। একজন বললেন, “ঈসা (আ.) মারা গেছেন, কুরআনেই তো আছে।” পাশ থেকে আরেকজন একটু রেগে উত্তর দিলেন, “আল্লাহ কি না পারেন? তিনি চাইলে কি একজন নবীকে আকাশে জীবিত রাখতে পারেন না?”
কথাটা শুনতে খুব ভক্তিপূর্ণ মনে হয়। কিন্তু একটু থামলে বোঝা যায়, এখানে দুটি আলাদা প্রশ্ন মিশে গেছে। একটি হলো, আল্লাহ কী করতে পারেন। আরেকটি হলো, আল্লাহ আসলে কী করেছেন।
প্রশ্নটা ক্ষমতার নয়, খবরের
আল্লাহ সবকিছু করতে পারেন, এ নিয়ে কোনো মুসলমানের সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি কী করেছেন, তা আমরা নিজেরা ঠিক করে দিই না। সেটা জানতে হয় তাঁর নিজের কথা থেকে, অর্থাৎ পবিত্র কুরআন থেকে।
আর ঈসা (আ.)-এর ব্যাপারে আল্লাহ নিজেই তাঁর পরিকল্পনা জানিয়ে দিয়েছেন:
আল্লাহ যদি বলতেন, “আমি তাকে আকাশে তুলে রেখেছি, শেষ যুগে ফেরত পাঠাব”, তাহলে আমরা চোখ বুজে তা মেনে নিতাম। কিন্তু তিনি বলেছেন, “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব।” তাহলে “আল্লাহ কি না পারেন” প্রশ্নটা এখানে আসে কোথা থেকে?
আল্লাহ যা বলেননি, তা তাঁর নামে চাপিয়ে দেওয়া ভক্তি নয়। ভক্তি হলো, তিনি যা বলেছেন তা বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া।
আল্লাহর একটি নিয়ম আছে, যা বদলায় না
আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আবার তিনি প্রজ্ঞাময়ও। তিনি এই জগৎ চালান কিছু নির্দিষ্ট নিয়মে। আম গাছে আম ধরে, কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল। আল্লাহ চাইলে উল্টোটাও পারেন, কিন্তু তিনি তা করেন না। কারণ এটাই তাঁর নিয়ম, যাকে কুরআন বলে “সুন্নাতুল্লাহ”।
মানুষের জন্য আল্লাহর নিয়ম কী? মানুষ পৃথিবীতে জন্মায়, পৃথিবীতে বাঁচে, পৃথিবীতেই মারা যায়। নবীরাও মানুষ। তাঁরাও খেয়েছেন, ঘুমিয়েছেন, অসুস্থ হয়েছেন, আর একদিন ইন্তেকাল করেছেন।
নবীদের রক্ষা করার আল্লাহর পদ্ধতি
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখুন। প্রায় প্রত্যেক নবীর শত্রুরা তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। আর আল্লাহ প্রত্যেককে রক্ষাও করেছেন। কিন্তু কীভাবে?
হযরত নূহ (আ.)-কে মহাপ্লাবন থেকে বাঁচানো হয়েছিল একটি নৌকায়, আকাশে নয়। হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে আগুনে ফেলা হলে আল্লাহ তাঁকে আকাশে তুলে নেননি, বরং আগুনকেই হুকুম দিয়েছিলেন:
হযরত মূসা (আ.)-কে ফেরাউনের হাত থেকে বাঁচানো হলো সমুদ্রের মাঝ দিয়ে পথ করে দিয়ে। আর সবচেয়ে প্রিয় নবী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)? মক্কার শত্রুরা যখন তাঁকে হত্যার জন্য ঘর ঘিরে ফেলল, আল্লাহ তাঁকে আকাশে তুলে নেননি। তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে সওর গুহায় আশ্রয় নিলেন, আর সেখানেই আল্লাহর সাহায্য এল:
এখন একটু ভাবুন। মহানবী (সা.)-কে রক্ষা করা হলো এই পৃথিবীতেই, একটি গুহায়। তাহলে ঈসা (আ.)-কে রক্ষা করার জন্য কেন তাঁকে আকাশে তুলে নিতে হবে? এর মানে কি এই দাঁড়ায় না যে, আল্লাহ পৃথিবীতে রেখে তাঁকে বাঁচাতে পারছিলেন না? নাউযুবিল্লাহ। “আল্লাহ কি না পারেন” প্রশ্নটা তাই উল্টো দিকেই ফিরে আসে।
আল্লাহর পরিকল্পনাই সবচেয়ে উত্তম
ঈসা (আ.)-এর শত্রুরা ষড়যন্ত্র করেছিল। কুরআন বলে, আল্লাহও পরিকল্পনা করেছিলেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৫)।
মিশরের বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শায়খ মাহমুদ শালতূত এই আয়াতগুলো নিয়ে একটি ফতোয়া লিখেছিলেন, যা alislam.org-এ প্রকাশিত আছে। তিনি বলেছেন, নবীদের শত্রুরা যখন তাঁদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন আল্লাহ তাঁদের নিজের শক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে রক্ষা করেন, আর শত্রুদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন। ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। তিনি নিহত হননি, অভিশপ্তও হননি, বরং পূর্ণ জীবন কাটিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আল্লাহর কাছে সম্মানিত হয়েছেন।
শায়খ শালতূত আরও প্রশ্ন তুলেছেন: কাউকে শত্রুদের মাঝখান থেকে সশরীরে আকাশে তুলে নেওয়াকে কীভাবে “পরিকল্পনা” বলা যায়, যেখানে শত্রুদের কিছুই করার নেই? পরিকল্পনা তো সেটাই, যেখানে আল্লাহ তাঁর নিয়মের ভেতরে থেকেই শত্রুর চাল ব্যর্থ করে দেন।
তাই আসল প্রশ্নটা “আল্লাহ কি না পারেন” নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আল্লাহ কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব।” আর তাঁর নিয়ম কখনো বদলায় না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ঈসা (আ.)-এর জন্মই তো অলৌকিক, তাহলে আকাশে থাকাটাও অলৌকিক হতে পারে না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, যাঁর জন্ম বিনা পিতায় হয়েছে, তাঁর জীবনও সাধারণ নিয়মে চলবে কেন? চলুন দেখি। ঈসা (আ.)-এর জন্মের ঘটনা কুরআন নিজে বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। তাই আমরা তা মানি। কিন্তু সশরীরে আকাশে গিয়ে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকার কথা কুরআনের কোথাও নেই। উল্টো, কুরআন সব মানুষের জন্য একটি সাধারণ ঘোষণা দিয়েছে:
অলৌকিক ঘটনা মানতে হয় তখনই, যখন আল্লাহ নিজে তা জানান। যেখানে আল্লাহ জানিয়েছেন “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব”, সেখানে নিজেদের পক্ষ থেকে অলৌকিকতা যোগ করার অধিকার কারো নেই।
মহানবী (সা.) তো মিরাজে আকাশে গিয়েছিলেন?
মিরাজের ঘটনা সহীহ বুখারীতে মহানবী (সা.) নিজেই বর্ণনা করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, তিনি তখন ছিলেন “ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায়” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২০৭)। অর্থাৎ এটি ছিল এক উচ্চ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
আর লক্ষ করুন, সেই সফরে দ্বিতীয় আসমানে তিনি ঈসা (আ.)-কে দেখেছিলেন হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে একত্রে। ইয়াহইয়া (আ.) যে বহু আগে মারা গেছেন, এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। alislam.org-এর প্রবন্ধে তাই বলা হয়েছে, মৃতদের সাথে জীবিত কেউ একসাথে থাকেন না। মিরাজ বরং প্রমাণ করে, ঈসা (আ.) অন্য নবীদের মতোই পরলোকে আছেন।
দুই হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখা কি আল্লাহর পক্ষে কঠিন?
না, কঠিন নয়। কিন্তু আল্লাহ নিজেই বলেছেন, দীর্ঘ জীবনের সাথে তিনি কী করেন:
তাহলে দুই হাজার বছর পর যিনি ফিরবেন, তিনি কি অতি দুর্বল, ক্ষয়প্রাপ্ত দেহ নিয়ে ফিরবেন? আর যদি বলা হয় তাঁর বয়স একটুও বাড়েনি, তাহলে তাঁকে মানুষের সব নিয়মের ঊর্ধ্বে তুলে দেওয়া হয়, যা একমাত্র আল্লাহর গুণ। প্রশ্নটা তাই আল্লাহর শক্তির নয়, আল্লাহর ঘোষিত নিয়মের। আর সেই নিয়ম কুরআনে স্পষ্ট লেখা।
সংক্ষেপে
- আল্লাহ সব পারেন, কিন্তু তিনি কী করেছেন তা জানতে হয় তাঁর নিজের বাণী থেকে।
- কুরআনে আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে বলেছেন, “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব।”
- আল্লাহর নিয়মে কোনো পরিবর্তন হয় না; মানুষ পৃথিবীতে বাঁচে, পৃথিবীতেই মারা যায়।
- নূহ, ইবরাহীম, মূসা (আ.) এবং মহানবী (সা.)-কে আল্লাহ পৃথিবীতেই রক্ষা করেছেন; ঈসা (আ.)-কেও তা-ই করেছেন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.