দুই হাজার বছর ধরে দুটি জাতি একটি বিষয়ে আশ্চর্যভাবে একমত। ইহুদিরা বলে, ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা গেছেন। খ্রিস্টানরাও বলে, ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা গেছেন। অথচ এই দুই জাতি আর কোনো বিষয়ে প্রায় একমত হয় না।
কেন তারা এই একটি কথা এত শক্ত করে ধরে রেখেছে? আর পবিত্র কুরআন এ সম্পর্কে কী বলে? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে একটি বহুল আলোচিত আয়াতের অর্থ।
আপত্তিটি কী?
অনেক আলেম এই আয়াতের অর্থ করেন এভাবে: আহলে কিতাবের প্রত্যেকে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর আগে তাঁর ওপর ঈমান আনবে। তাঁরা বলেন, এখনো সব ইহুদি-খ্রিস্টান তাঁর ওপর ঈমান আনেনি। সুতরাং ঈসা (আ.) এখনো মারা যাননি; তিনি আকাশে জীবিত আছেন, ফিরে আসবেন, তখন সবাই ঈমান আনবে, তারপর তিনি মারা যাবেন।
শুনতে গোছানো মনে হয়। কিন্তু একটু হিসাব করলেই সমস্যাগুলো বেরিয়ে আসে।
প্রসঙ্গটা মনে রাখুন
এই আয়াতটি একা আসেনি। ঠিক আগের দুটি আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ইহুদিরা দাবি করে তারা মসীহকে হত্যা করেছে, অথচ তারা তাঁকে হত্যাও করেনি, ক্রুশে মারতেও পারেনি। আর যারা এ নিয়ে মতভেদ করে, তারা ঘোর সন্দেহে আছে, তাদের নিশ্চিত জ্ঞান নেই, শুধু অনুমান (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৮)।
তারপরই এই আয়াত: আহলে কিতাবের প্রত্যেকে নিজ মৃত্যুর আগে “ইহার” ওপর বিশ্বাস রাখবে। কিসের ওপর? আলোচনা চলছে ক্রুশে মৃত্যুর দাবি নিয়ে। তাই আহমদীয়া অনুবাদ বন্ধনীতে লিখেছে: “(ঈসার ক্রুশীয় মৃত্যুর)”।
alislam.org-এর তফসীর এর কারণটিও ব্যাখ্যা করেছে। ইহুদিদের এই বিশ্বাস আঁকড়ে থাকতেই হবে, কারণ তাওরাত অনুযায়ী যে গাছে ঝোলে সে অভিশপ্ত (দ্বিতীয় বিবরণ ২১:২৩)। ক্রুশে মৃত্যু না মানলে ঈসা (আ.)-কে মিথ্যা নবী বলার ভিত্তিই ভেঙে পড়ে। আর খ্রিস্টানদের এই বিশ্বাস আঁকড়ে থাকতেই হবে, কারণ তাদের প্রায়শ্চিত্তবাদ, অর্থাৎ যিশু ক্রুশে মরে মানুষের পাপের বোঝা নিয়েছেন, এর ওপরই দাঁড়িয়ে (গালাতীয় ৩:১৩)। ক্রুশে মৃত্যু না হলে পুরো খ্রিস্টধর্মের কাঠামো ধসে পড়ে।
তাই দুই জাতিই, প্রমাণ ছাড়াই, মৃত্যু পর্যন্ত এই বিশ্বাস ধরে রাখে। কুরআন চৌদ্দশ বছর আগে যা বলেছিল, আজও ঠিক তা-ই ঘটছে।
“তার মৃত্যু” মানে কার মৃত্যু?
আয়াতে আছে কাবলা মাওতিহি, “তার মৃত্যুর আগে”। এই “তার” কে? আহমদীয়া অনুবাদ বলে, আহলে কিতাবের প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের মৃত্যু।
এর পক্ষে একটি শক্তিশালী সাক্ষ্য আছে। মহানবী (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী, কুরআনের প্রসিদ্ধ ক্বারী হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর কিরাআতে (পাঠরীতিতে) শব্দটি ছিল মাওতিহিম, অর্থাৎ “তাদের মৃত্যুর আগে”। alislam.org-এর তফসীর এই বর্ণনাটি তফসীরে ইবনে জারীর (৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩)-এর বরাতে উল্লেখ করেছে। প্রসিদ্ধ তফসীরকারক যামাখশারীও তাঁর তফসীর “আল-কাশশাফ”-এ উবাই (রা.)-এর এই পাঠ উল্লেখ করেছেন, যা alislam.org-এর আরেকটি প্রবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছে।
তাহলে “তার মৃত্যু” মানে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু নয়, বরং আহলে কিতাবের প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু। আয়াতের সাথে ঈসা (আ.)-এর আকাশে বেঁচে থাকার কোনো সম্পর্কই থাকে না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ঈসা (আ.) ফিরে এলে তখনকার সব আহলে কিতাব ঈমান আনবে, আয়াতের অর্থ কি এটা হতে পারে না?
এখানে কেউ কেউ এভাবে ব্যাখ্যা করেন। চলুন হিসাবটা দেখি। আয়াতে বলা হয়েছে আহলে কিতাবের “প্রত্যেক ব্যক্তি”, কোনো এক যুগের লোক নয়। গত দুই হাজার বছরে কোটি কোটি ইহুদি-খ্রিস্টান ঈসা (আ.)-এর ওপর ঈমান না এনেই মারা গেছেন। alislam.org-এর প্রবন্ধ তাই প্রশ্ন তুলেছে: সবাইকে ঈমান আনতে হলে তো তাদের সবাইকেও ঈসা (আ.)-এর সাথে জীবিত থাকতে হতো, যা স্পষ্টতই অসম্ভব।
তা ছাড়া কুরআন নিজেই বলেছে, এই জাতিগুলো কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে:
আর ঈসা (আ.)-কে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতেও আছে, তাঁর অনুসারীদের অস্বীকারকারীদের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হবে “কিয়ামত দিবস পর্যন্ত” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৬)। কিয়ামত পর্যন্ত যদি অস্বীকারকারী থাকে, তাহলে কোনো এক সময়ে সবাই ঈমান এনে ফেলবে, এ কথা কুরআনের সাথে মেলে না।
সবাই যদি ঈমানই আনে, কিয়ামতের দিন ঈসা (আ.) তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন কেন?
আয়াতের শেষ অংশটি লক্ষ করুন: “সে (ঈসা) কিয়ামতের দিনে তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হইবে।” যারা সত্যিকারের ঈমান এনেছে, একজন নবী তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন না। বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া হয় ভুল বিশ্বাসের জন্য। তাই আয়াতে যে বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, তা প্রশংসার কিছু নয়; বরং সেটি এমন এক ভুল ধারণা, যার জন্য ঈসা (আ.) নিজে তাদের বিপক্ষে দাঁড়াবেন। ক্রুশে মৃত্যুর বিশ্বাস ঠিক এমনই একটি বিষয়।
এই আয়াতের কি আর কোনো ব্যাখ্যা নেই?
আছে। alislam.org-এর কুরআন অ্যাপের টীকায় আরেকটি সুন্দর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে: এখানে “প্রত্যেক ব্যক্তি” না ধরে “প্রত্যেক গোত্র” ধরলে অর্থ দাঁড়ায়, বনী ইসরাঈলের এমন কোনো গোত্র থাকবে না, যার কিছু লোক ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর আগে তাঁর ওপর ঈমান আনেনি। এটি ইঙ্গিত করে, ক্রুশ থেকে বেঁচে যাওয়ার পর ঈসা (আ.) ইসরাঈলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রগুলোর কাছে গিয়েছিলেন, যেমনটি তিনি নিজে বলেছিলেন (মথি ১৫:২৪)। এই ব্যাখ্যাতেও আয়াতটি তাঁর আকাশে জীবিত থাকার পক্ষে কিছু বলে না, বরং পৃথিবীতে তাঁর দীর্ঘ মিশনের দিকেই ইঙ্গিত করে।
সংক্ষেপে
- আয়াতের প্রসঙ্গ ঈসা (আ.)-এর ক্রুশে মৃত্যুর দাবি; ইহুদি ও খ্রিস্টান উভয়ে মৃত্যু পর্যন্ত এই বিশ্বাস আঁকড়ে থাকে।
- হযরত উবাই (রা.)-এর পাঠে “তাদের মৃত্যুর আগে”, অর্থাৎ মৃত্যু আহলে কিতাবের প্রত্যেকের নিজের।
- কোটি কোটি আহলে কিতাব ঈমান না এনে মারা গেছে; কুরআন বলে কিয়ামত পর্যন্ত অস্বীকারকারী থাকবে।
- ঈসা (আ.) তাদের “বিরুদ্ধে” সাক্ষী হবেন, তাই আয়াতের বিশ্বাসটি একটি ভুল বিশ্বাস, প্রকৃত ঈমান নয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Holy Quran 4:160 (with commentary) · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.