মুনশী ইলাহী বখশ ছিলেন একজন হিসাবরক্ষক। এক সময় তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ভক্ত ছিলেন, পরে বিরোধী হয়ে যান। নিজেকে ইলহামপ্রাপ্ত দাবি করে তিনি আসায়ে মূসা নামে একটি বই লেখেন, যাতে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ব্যক্তিগত জীবন ও ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে নানা অভিযোগ তোলা হয়।
১৯০০ সালে আরবাঈন চতুর্থ খণ্ডে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লেখেন, তিনি বইটি পেয়েছেন, দেখেছেন যে এতে শুধু কুধারণার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে। বইটি সরিয়ে রাখার পর তাঁর প্রতি একটি আরবি ইলহাম হলো।
আপত্তিটি কী
ইলহামের শুরুর অংশ হলো: “ইউরীদূনা আন ইয়ারাও তামসাকা”, তারা তোমার হায়েয দেখতে চায়। বিরোধীরা এই একটি বাক্য তুলে বলেন, একজন পুরুষের সম্পর্কে এমন কথা অশোভন, আর কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে এর এমন অর্থ করেন যা তিনি কখনও বলেননি।
পুরো ইলহাম ও তাঁর নিজের ব্যাখ্যা
পুরো ইলহামটি এরকম: “ইউরীদূনা আন ইয়ারাও তামসাকা, ওয়াল্লাহু ইউরীদু আন ইউরিয়াকা ইন‘আমাহু, আল-ইন‘আমাতুল মুতাওয়াতিরা”, অর্থাৎ তারা তোমার হায়েয দেখতে চায়, আর আল্লাহ চান তোমাকে তাঁর অবিরাম অনুগ্রহ দেখাতে।
আরবাঈন-এ ইলহামটির পাশেই তিনি লিখেছেন, এর অর্থ তারা অপবিত্রতা, নোংরামি ও দোষ খুঁজছে; আর প্রশ্ন রেখেছেন, তারা আমার মধ্যে হায়েযের মতো কোনো কিছু কোথায় পাবে? (রূহানী খাযায়েন ১৭, পৃ. ৪৫২, পাদটীকা)
পরে তাতিম্মা হকীকাতুল ওহী-তে তিনি আরও বিস্তারিত লিখেছেন (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৫৮১)। তার ভাবার্থ:
“অর্থাৎ বাবু ইলাহী বখশ চায় তোমার হায়েয দেখতে, বা কোনো অপবিত্রতা ও নাপাকির খবর পেতে; কিন্তু আল্লাহ তোমাকে তাঁর অবিরাম অনুগ্রহ দেখাবেন। আর তোমার মধ্যে হায়েয নেই, বরং তা একটি শিশু হয়ে গেছে, এমন শিশু যে ‘আল্লাহর সন্তানদের’ মর্যাদায়। অর্থাৎ হায়েয একটি নাপাক জিনিস, কিন্তু শিশুর দেহ তা থেকেই তৈরি হয়। তেমনি মানুষ যখন আল্লাহর হয়ে যায়, তখন মানব স্বভাবে যে অপবিত্রতা লেগে থাকে, তা থেকেই একটি আধ্যাত্মিক দেহ তৈরি হয়।”
অর্থাৎ শব্দটি এসেছে শত্রুর উদ্দেশ্য বোঝাতে: সে খুঁত খুঁজছে, নোংরা কিছু বের করতে চাইছে। আর আল্লাহর জবাব হলো, তুমি খুঁত খুঁজে পাবে না; বরং আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ দেখাবেন। একজন পুরুষের শারীরিক কোনো অবস্থার কথা এখানে নেই, এটি সম্পূর্ণ রূপক।
ইসলামী ভাষায় এমন রূপক নতুন নয়
শরীরের গোপন বিষয়ের শব্দ দিয়ে মানুষের দোষ বোঝানো আরবি ভাষার পুরোনো রীতি। মহানবী (সা.) বলেছেন: “মুসলমানদের গীবত করো না, আর তাদের ‘আওরাত’-এর পেছনে লেগো না; কারণ যে তাদের ‘আওরাত’ খুঁজে বেড়ায়, আল্লাহ তার ‘আওরাত’ খুঁজে বের করেন, আর আল্লাহ যার ‘আওরাত’ খোঁজেন, তাকে তার ঘরের মধ্যেই লাঞ্ছিত করেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৮০)
“আওরাত” শব্দের আক্ষরিক অর্থ শরীরের গোপন অঙ্গ। কিন্তু হাদীসে এর অর্থ মানুষের গোপন দোষত্রুটি। কেউ এই হাদীস পড়ে আক্ষরিক অর্থ ধরেন না। ইলহামের “হায়েয” শব্দও একই রীতিতে এসেছে: শত্রু খুঁজছে অপবিত্রতা আর দোষ।
আর লক্ষ করুন, হাদীসটিতে দোষ খোঁজাকারীর পরিণতিও বলা আছে। ইলহামেও একই কথা: যে খুঁত খুঁজবে সে ব্যর্থ হবে, আর যার খুঁত খোঁজা হচ্ছে, তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হবে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এমন শব্দ কি আল্লাহর বাণীতে আসতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, এমন শব্দ ধর্মীয় আলোচনায় আসাই অশোভন। অথচ কুরআন নিজেই এই বিষয়ে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছে, আর একই আয়াতে পবিত্রতা ও তওবার কথা জুড়ে দিয়েছে:
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাতিম্মা হকীকাতুল ওহী-তে ঠিক এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের স্বভাবে কিছু অপবিত্রতা আছে, কিন্তু যে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফেরে, তার জন্য সেটিই পবিত্র আধ্যাত্মিক জন্মের কারণ হয়। এ কারণেই নবীরা গোপন দুর্বলতার কথা ভেবে সবসময় ইস্তিগফার করতেন। ব্যাখ্যাটি কুরআনের এই আয়াতেরই প্রতিধ্বনি: আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।
“আল্লাহর সন্তানদের মর্যাদা” কথাটি কি শিরক নয়?
একই জায়গায় তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, এর অর্থ এই নয় যে তারা সত্যিই আল্লাহর সন্তান; এমন বলা কুফর, কারণ আল্লাহ সন্তান থেকে পবিত্র। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের রূপক অর্থে এমন বলা হয়, কারণ তারা নিষ্পাপ শিশুর মতো গভীর আবেগে আল্লাহকে স্মরণ করে। এর দলিল হিসেবে তিনি কুরআনের আয়াত দিয়েছেন: “তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর যেমন তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ কর” (সূরা আল-বাকারা ২:২০১), আর সূরা ইখলাসের “তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি” (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৫৮২)।
তাহলে বিরোধীরা যে অর্থ প্রচার করেন, তার ভিত্তি কী?
কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর কোনো লেখায় এমন কথা নেই যে তাঁর শরীরে এমন কিছু ঘটেছে। বরং ইলহামের সাথেই তিনি লিখেছেন, “তারা আমার মধ্যে হায়েযের মতো কোনো কিছু কোথায় পাবে?” যে বাক্যের অর্থ বক্তা নিজেই একই জায়গায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তার উল্টো অর্থ প্রচার করা ন্যায়বিচার নয়। আর কুরআন আমাদের শিখিয়েছে, যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার পেছনে না ছুটতে (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩৭)।
সংক্ষেপে
- ইলহামটি এসেছিল মুনশী ইলাহী বখশের অভিযোগে ভরা বই আসায়ে মূসা পড়ার পর, ১৯০০ সালে আরবাঈনে প্রকাশিত হয়।
- এর অর্থ: শত্রুরা তোমার মধ্যে অপবিত্রতা ও দোষ খুঁজতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তোমাকে অবিরাম অনুগ্রহ দেখাবেন (রূহানী খাযায়েন ১৭, পৃ. ৪৫২; ২২, পৃ. ৫৮১)।
- হাদীসে “আওরাত” শব্দ দিয়ে গোপন দোষ বোঝানো হয়েছে (আবু দাউদ ৪৮৮০); ইলহামের শব্দও একই রীতির রূপক।
- তিনি কুরআনের ২:২২৩ আয়াত দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন: তওবা মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতাকে আধ্যাত্মিক জন্মে বদলে দেয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Responding to allegations: ‘They desire to see menstruation blood in you’ · alhakam.org
- Haqiqatul-Wahi (The Philosophy of Divine Revelation) · alislam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.