একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়: “তেরোশো বছর ধরে উম্মতের কোনো আলেম কি এ কথা বুঝলেন না? শুধু আহমদী মুসলমানরাই বুঝল?” প্রশ্নটি আন্তরিক। এর উত্তর পেতে আমাদের ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হবে, একেবারে প্রথম যুগ থেকে।
প্রথম যুগ: সাহাবী ও আহলে বাইত
শুরু করি মহানবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে দিয়ে, যাঁর জন্য মহানবী (সা.) কুরআনের জ্ঞানের দোয়া করেছিলেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৫)। সূরা আলে ইমরানের “ইন্নী মুতাওয়াফ্ফীকা” শব্দের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন:
ইমাম বুখারী (রহ.) এই ব্যাখ্যাটি তাঁর সহীহ গ্রন্থে এনেছেন সূরা আল-মায়েদার আলোচনায়, যেখানে কিয়ামতের দিন ঈসা (আ.)-এর উত্তর “ফালাম্মা তাওয়াফ্ফাইতানী” আছে। অর্থাৎ ইমাম বুখারী (রহ.)-ও দুটি আয়াতকে একই অর্থে বুঝেছেন।
এরপর সাহাবীদের প্রথম ইজমা। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের দিন হযরত আবু বকর (রা.) পড়লেন, “তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে” (৩:১৪৫), আর উপস্থিত কোনো সাহাবী ঈসা (আ.)-কে ব্যতিক্রম বলেননি (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৫৪)।
আহলে বাইতের সাক্ষ্যও আছে। হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদতের পর তাঁর পুত্র হযরত ইমাম হাসান (রা.) খুতবায় বলেছিলেন, তাঁর পিতা রমজানের সাতাশতম রাতে ইন্তেকাল করেছেন, যে রাতে ঈসা (আ.)-এর রূহ আকাশে তুলে নেওয়া হয়েছিল (তাবাকাতে ইবনে সা’দ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৬, আলইসলাম.অর্গের উল্লেখ অনুযায়ী)। হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) “দাওয়াতুল আমীর” গ্রন্থে লিখেছেন, ঈসা (আ.)-এর স্বাভাবিক মৃত্যুতে বিশ্বাস না থাকলে ইমাম হাসান (রা.) দুটি মৃত্যুকে এভাবে পাশাপাশি রাখতেন না।
ইমাম ও মুফাসসিরদের যুগ
ইমাম মালিক (রহ.)। মদিনার এই মহান ইমাম সম্পর্কে “মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার” গ্রন্থে লেখা আছে, অধিকাংশ মানুষ বলে ঈসা (আ.) মারা যাননি, কিন্তু ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন তিনি মারা গেছেন (মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৬)।
ইমাম ইবনে হাযম (রহ.)। পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর এই বিখ্যাত আন্দালুসীয় আলেমকে আলইসলাম.অর্গে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুতে বিশ্বাসীদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এই লেখার সূত্র-প্রবন্ধে তাঁর গ্রন্থ “আল-মুহাল্লা”র উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি “ফালাম্মা তাওয়াফ্ফাইতানী” আয়াতের অর্থ মৃত্যুই বুঝেছেন।
যামাখশারী (রহ.)। আরবি ভাষার এই বিখ্যাত পণ্ডিত তাঁর তফসীর “আল-কাশ্শাফ”-এ “মুতাওয়াফ্ফীকা”র ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে শত্রুদের হাতে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করবেন, তাঁর নির্ধারিত আয়ু পূর্ণ করাবেন এবং স্বাভাবিক মৃত্যু দেবেন।
আলইসলাম.অর্গের একটি প্রবন্ধে এই তালিকায় ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.), কাতাদা (রহ.) ও ওয়াহব (রহ.)-এর নামও আছে।
আমাদের যুগ: আল-আযহারের ফতোয়া
বিংশ শতাব্দীতে মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর শায়খ মাহমুদ শালতুত (রহ.) একটি ফতোয়া দেন, যা কায়রোর “আল-মাজাল্লা” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি কুরআনের তিনটি জায়গা, সূরা আলে ইমরান, সূরা আন-নিসা আর সূরা আল-মায়েদা, বিশ্লেষণ করে তিনটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান:
এক, কুরআন বা সহীহ হাদীসে এমন কিছু নেই যা প্রমাণ করে ঈসা (আ.)-কে সশরীরে আকাশে তোলা হয়েছে আর তিনি সেখানে জীবিত আছেন। দুই, আয়াতগুলো থেকে শুধু এটুকুই বোঝা যায় যে আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে মৃত্যু দেবেন, উন্নীত করবেন ও অপবাদমুক্ত করবেন, আর সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছে। তিন, যে মুসলমান এই সশরীরে আকাশে থাকার বিশ্বাস অস্বীকার করেন, তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যান না।
তিনি বিখ্যাত মুফাসসির আলূসী (রহ.)-এর ব্যাখ্যাও উল্লেখ করেছেন: “মুতাওয়াফ্ফীকা” মানে আল্লাহ ঈসা (আ.)-এর আয়ু পূর্ণ করাবেন এবং শত্রুদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু দেবেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
উম্মতের ইজমা তো ঈসা (আ.)-এর জীবিত থাকার পক্ষে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, পুরো উম্মত একমত যে ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত, তাই এর বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না। চলুন দেখি। ইজমা মানে সবার একমত্য। অথচ আমরা দেখলাম, ইবনে আব্বাস (রা.), ইমাম মালিক (রহ.), ইবনে হাযম (রহ.), যামাখশারী (রহ.) আর আধুনিক যুগে শায়খ শালতুত (রহ.) ভিন্ন কথা বলেছেন। যেখানে এত বড় বড় নাম দ্বিমত করেছেন, সেখানে ইজমার দাবি টেকে না। আর সাহাবীদের যে একটি ইজমা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের দিনের, সেটি ছিল সব রসূলের মৃত্যুর পক্ষে।
ইমাম মালিক (রহ.)-এর উক্তির পাশেই তো লেখা, অধিকাংশ মানুষ ভিন্নমত পোষণ করেন?
হ্যাঁ, আর এটিই আসল শিক্ষা। “মাজমাউ বিহারিল আনওয়ার”-এর লেখক নিজেই স্বীকার করছেন যে বিষয়টিতে মতভেদ ছিল, আর মদিনার ইমাম মৃত্যুর পক্ষে ছিলেন। সত্য নির্ধারণ হয় সংখ্যা দিয়ে নয়, কুরআন ও সুন্নাহর প্রমাণ দিয়ে। আর সেই প্রমাণ আমরা অন্য লেখাগুলোতে বিস্তারিত দেখেছি: “তাওয়াফ্ফা”র অর্থ, আবু বকর (রা.)-এর তিলাওয়াত, কিয়ামতের দিনের সাক্ষ্য।
এসব কি কয়েকজনের বিচ্ছিন্ন মত নয়?
আমরা এই আলেমদের কথা এ জন্য আনিনি যে তাঁদের মতই চূড়ান্ত দলিল। দলিল কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর হাদীস। এই উদ্ধৃতিগুলো শুধু একটি অভিযোগের জবাব দেয়: “এটি নতুন আবিষ্কার।” না, এটি নতুন নয়। প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের শ্রেষ্ঠ আলেমদের একটি ধারা এই সত্য বলে এসেছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই সত্যকে কুরআনের আলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
শায়খ শালতুত (রহ.) কি আহমদী মুসলমানদের প্রভাবে এ কথা বলেছেন?
না। তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-আযহারের রেক্টর, আহমদীয়া মুসলিম জামাতের সদস্য নন। তাঁর ফতোয়ায় তিনি নিজেই দেখিয়েছেন, তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কুরআনের তিনটি জায়গা পাশাপাশি পড়ে, “তাওয়াফ্ফা” শব্দের কুরআনি ব্যবহার দেখে, আর আলূসী (রহ.)-এর মতো মুফাসসিরের ব্যাখ্যা থেকে। যে কেউ খোলা মনে কুরআন পড়লে একই জায়গায় পৌঁছাতে পারেন; শালতুত (রহ.)-এর ফতোয়া তারই একটি দৃষ্টান্ত।
সংক্ষেপে
- হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) “মুতাওয়াফ্ফীকা”র অর্থ করেছেন “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব”; ইমাম বুখারী (রহ.) তা সংরক্ষণ করেছেন।
- সাহাবীদের প্রথম ইজমা ছিল সব রসূলের মৃত্যুর পক্ষে; ইমাম হাসান (রা.)-এর খুতবাও একই দিকে ইঙ্গিত করে।
- ইমাম মালিক (রহ.), ইবনে হাযম (রহ.) ও যামাখশারী (রহ.)-এর লেখায় একই মত পাওয়া যায়।
- আল-আযহারের রেক্টর শায়খ শালতুত (রহ.) ফতোয়া দিয়েছেন, সশরীরে আকাশে থাকার পক্ষে কুরআন বা সহীহ হাদীসে কিছু নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Family of the Holy Prophet agreed on the Death of Jesus · alislam.org
- The ‘Ascension’ of Jesus (Shaikh Mahmoud Shaltout) · alislam.org
- Death of Hazrat Jesus (as) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.