উনিশ শতকের শেষ দশক। পাঞ্জাবের কোনো এক মসজিদে একজন মানুষ নামায শেষ করে বেরিয়ে গেলেন। তিনি আহমদী, এ কথা জানাজানি হতেই কয়েকজন পানি এনে মসজিদের যে জায়গায় তিনি দাঁড়িয়েছিলেন, সেটি ধুয়ে ফেললেন, যেন কোনো অপবিত্রতা লেগে গেছে।
এমন ঘটনা তখন বিচ্ছিন্ন ছিল না। আজ যে প্রশ্নটি প্রায়ই শোনা যায়, “আহমদী মুসলমানরা কেন আমাদের পেছনে নামায পড়েন না?”, তার উত্তর বুঝতে হলে এই দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে।
আপত্তিটি কী?
বলা হয়, আহমদী মুসলমানরা অন্য মুসলমান ইমামের পেছনে নামায পড়েন না, অন্যদের জানাযায় শরিক হন না, আর নিজেদের মেয়েদের অন্যদের সাথে বিয়ে দেন না। এ থেকে সিদ্ধান্ত টানা হয়, তাঁরা নিজেদের মুসলিম উম্মাহ থেকে আলাদা করে নিয়েছেন।
প্রশ্নটি ন্যায্য, তাই উত্তরও ন্যায্যভাবে দেওয়া দরকার: আগে দেখি কে কাকে কী বলেছিলেন, তারপর দেখি আহমদীয়া মুসলিম জামাত কী নিয়ম মানে এবং কেন।
ফতোয়াগুলো এসেছিল আগে
১৮৮৯ সালে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) বয়আত নেওয়া শুরু করেন, ১৮৯১ সালে প্রতিশ্রুত মসীহ হওয়ার ঘোষণা দেন। এর পরপরই উপমহাদেশের বড় বড় আলেমদের কাছ থেকে একের পর এক ফতোয়া আসতে থাকে। কয়েকটি উদাহরণ:
দিল্লির মৌলভী নযীর হোসেন সাহেব ১৮৯২ সালে ঘোষণা দেন, মির্যা সাহেব বা তাঁর অনুসারীদের সালাম দেওয়া যাবে না, তাঁদের দাওয়াত দেওয়া বা গ্রহণ করা যাবে না, তাঁদের পেছনে নামায পড়া যাবে না। (ইশাআতুস সুন্নাহ, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫) মৌলভী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী ফতোয়া দেন, তাঁর বা তাঁর কোনো অনুসারীর পেছনে নামায পড়া হারাম। (শারঈ ফয়সালা, পৃষ্ঠা ৩১) আর মৌলভী আহমদ রেযা খান বেরেলভী লেখেন, আহমদীর পেছনে নামায, তার জানাযা, তার সাথে বিয়ে, তার জবাই করা পশুর গোশত, এমনকি তার সাথে ওঠাবসা ও কথা বলা, সবই মুরতাদের মতো নিষিদ্ধ। (হুসামুল হারামাইন, পৃষ্ঠা ৯৫)
এই ফতোয়াগুলো শহর-গ্রামের মসজিদে পড়ে শোনানো হলো। ফল হলো সেটিই, যা শুরুতে বলেছি: আহমদী মুসলমানদের মসজিদে ঢুকতে বাধা, কোথাও মারধর, কোথাও মেঝে ধোয়া।
এই অবস্থায়, জামাত প্রতিষ্ঠার প্রায় এগারো বছর পর, ১৯০০ সালে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিজেদের ইমামের পেছনে আলাদাভাবে নামায পড়ার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ যে দরজা অন্যরা আগেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তিনি শুধু তার সামনে দাঁড়িয়ে বিবাদ বাড়াতে নিষেধ করলেন। লক্ষণীয় যে, আজও কোনো অ-আহমদী মুসলমান আহমদী মসজিদে এসে আলাদাভাবে নামায পড়তে চাইলে তাঁকে বাধা দেওয়া হয় না।
মহানবী (সা.)-এর একটি সতর্কবাণী
এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসে: একজন ইমাম যদি আমাকে কাফের মনে করেন, তাঁর পেছনে দাঁড়ানোর অর্থ কী? মহানবী (সা.) কাউকে কাফের বলার বিষয়ে একটি কঠোর নিয়ম বলে গেছেন:
যে আলেম একজন কালেমা-পড়া মুসলমানকে কাফের ঘোষণা করেছেন, এই হাদীস অনুযায়ী সেই রায় কার ওপর পড়ে, তা তিনি নিজেই ভেবে দেখুন। আহমদী মুসলমানরা বলেন, আমরা কারও ঈমান মাপার জন্য বসিনি; কিন্তু যিনি আমাদের নামাযকেই বাতিল মনে করেন, তাঁকে আমাদের নামাযের ইমাম বানানো যুক্তির কথা নয়।
নামায আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার শর্ত নিয়ে কুরআনও একটি মূলনীতি দিয়েছে। আদম (আ.)-এর দুই পুত্রের কাহিনিতে বলা হয়েছে:
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এই আয়াত উল্লেখ করে বলেছেন, এ কারণেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার নিজের নামায কবুল হওয়ার আশা নেই, তার পেছনে নামায পড়া উচিত নয়। আর আল্লাহর পাঠানো একজনের বিরোধিতায় যে অটল থাকে, সে ধীরে ধীরে ঈমানের নূর থেকে বঞ্চিত হয়। (আল-হাকাম, ১৭ মার্চ ১৯০৬)
জানাযা ও বিয়ে: জামাতের নিয়ম
জানাযা: ফতোয়ার যুগে আহমদী মুসলমানদের লাশ নিয়ে যা ঘটেছে, তা পড়লে চোখে পানি আসে। উড়িষ্যার কটকে ১৯১৮ সালে একজন আহমদী নারীকে মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হলে বিরোধীরা লাশ তুলে স্বামীর দরজায় ফেলে দিয়ে আসে। (আল-ফযল, ১৪ ডিসেম্বর ১৯১৮) বিরোধী আহলে হাদীস পত্রিকাই তখন লিখেছিল, কোনো আহমদী মারা গেলে কবরস্থানগুলোতে লাঠি হাতে পাহারা বসে, কাফন মেলে না, কবর খোঁড়ার লোক মেলে না। (আহলে হাদীস, আল-ফযল ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯১৮-এ উদ্ধৃত) যাঁরা আমাদের মৃতদের জানাযা হারাম ঘোষণা করেছেন এবং তাঁদের কবরও সহ্য করেননি, তাঁদের জানাযায় ইমামতি করতে না যাওয়া বিবাদ এড়ানোরই পথ।
বিয়ে: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নিয়ম হলো, আহমদী মেয়েদের বিয়ে জামাতের ভেতরেই হবে। এর কারণও সহজ। যে পরিবারের আলেমরা ফতোয়া দিয়েছেন যে আহমদীর সাথে বিয়েই হয় না, সেই পরিবারে একটি মেয়ে তার বিশ্বাস নিয়ে কতটা নিরাপদে থাকবে, আর তার সন্তানেরা কোন শিক্ষায় বড় হবে, এই চিন্তাই এখানে মুখ্য। পুরুষদের ক্ষেত্রে নিয়মটি তুলনামূলক শিথিল, তবে তাঁদেরও জামাতের ভেতরে বিয়েতেই উৎসাহিত করা হয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
হাদীসে তো আছে, প্রত্যেক মুসলমানের পেছনে নামায পড়া যায়, সে সৎ হোক বা পাপী?
এখানে কেউ কেউ সুনান আবু দাউদের একটি বর্ণনা তুলে ধরেন: “ফরয নামায প্রত্যেক মুসলমানের পেছনে ওয়াজিব, সে সৎ হোক বা পাপী।” (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুস সালাত, হাদীস ৫৯৪) চলুন দেখি। প্রথমত, হাদীস বিশারদরা এই বর্ণনার সনদকে দুর্বল বলেছেন। দ্বিতীয়ত, বর্ণনাটি যদি মেনেও নিই, এর শর্ত হলো “মুসলমান”। যে ইমাম নিজেই ফতোয়া দিয়েছেন যে আহমদী মুসলমানের নামায তাঁর পেছনে হয় না, এবং আহমদীকে মুসলমানই মানেন না, তিনি নিজেই এই দরজা বন্ধ করেছেন। যে নিয়ম অন্যরা ভেঙেছেন, তার দায় আহমদী মুসলমানদের ওপর চাপানো যায় না।
আলাদা নামায পড়লেই কি আলাদা ধর্ম হয়ে যায়?
তাহলে উপমহাদেশের অনেক ফিরকাই আলাদা ধর্ম হয়ে যেত। একই সময়ে দেওবন্দী, বেরেলভী ও আহলে হাদীস আলেমরা একে অপরের বিরুদ্ধেও কুফরের ফতোয়া দিয়েছেন এবং একে অপরের পেছনে নামায নিষিদ্ধ করেছেন। আজও অনেক শহরে প্রতিটি ধারার আলাদা মসজিদ আছে। কেউ তাঁদের বলেন না যে তাঁরা ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছেন। আহমদী মুসলমানদের জন্য আলাদা মাপকাঠি কেন?
আর আহমদী মুসলমানদের নামায কোন কিবলামুখী, কোন কালেমায় শুরু, কোন সূরায় পড়া হয়, তা যে কেউ গিয়ে দেখে আসতে পারেন। মহানবী (সা.) মুসলমানের পরিচয় এভাবেই দিয়েছেন:
তাহলে কি এই দূরত্ব চিরকাল থাকবে?
দূরত্বের শুরু হয়েছিল কুফরের ফতোয়া দিয়ে। আহমদী মুসলমানরা সালাম দেন, প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ান, মানবসেবায় ধর্ম দেখেন না। নামাযের প্রশ্নটি তাঁদের কাছে বিদ্বেষের নয়, বিশ্বাস আর শান্তি রক্ষার প্রশ্ন। যেদিন কাফের ঘোষণার ধারা থামবে, সেদিন আলোচনার পথও অনেক সহজ হবে।
সংক্ষেপে
- ১৮৯২ সাল থেকেই বিভিন্ন আলেম ফতোয়া দেন যে আহমদী মুসলমানের সাথে নামায, জানাযা ও বিয়ে নিষিদ্ধ; এরপর ১৯০০ সালে আলাদা নামাযের নির্দেশ আসে।
- মহানবী (সা.) বলেছেন, অন্যায়ভাবে কাউকে কাফের বললে তা বক্তার ওপরই ফিরে আসে; যিনি আমাদের কাফের মনে করেন, তাঁকে ইমাম বানানো যুক্তিসংগত নয়।
- আহমদী মুসলমানদের লাশের প্রতি অবমাননার ইতিহাস থেকেই জানাযার প্রশ্নে দূরত্ব এসেছে; মেয়েদের বিয়ে জামাতের ভেতরে হয় তাদের বিশ্বাস ও সন্তানদের শিক্ষা রক্ষার জন্য।
- বিভিন্ন ফিরকাও একে অপরের পেছনে নামায নিষিদ্ধ করেছে; আলাদা জামাতে নামায পড়া আলাদা ধর্মের প্রমাণ নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.