দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়ার দিকে তাকান। আপনি হাত তুললে ছায়াও হাত তোলে। আপনি হাঁটলে ছায়া হাঁটে। আপনি থেমে গেলে ছায়াও থামে।
ছায়া কি কখনো নিজে থেকে এক পা আগে যেতে পারে? পারে না। তার সব চলাফেরা মূল মানুষটির ওপর নির্ভর করে। এই ছোট্ট সত্যটি মনে রেখে আজকের আপত্তিটি দেখা যাক।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে কালিমাতুল ফসল নামের একটি বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয় (পৃষ্ঠা ১১৩)। তার মর্ম এমন: যিল্লি (ছায়া) নবুওয়ত মসীহ মওউদকে পেছনে সরায়নি, বরং সামনে বাড়িয়েছে, এতটা সামনে যে মহানবী (সা.)-এর কাঁধ বরাবর এনে দাঁড় করিয়েছে।
এ থেকে বিরোধীরা বলেন, আহমদী মুসলমানরা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে মহানবী (সা.)-এর সমান মর্যাদা দেয়।
প্রথম কথা: বইটি কার লেখা?
কালিমাতুল ফসল হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর লেখা নয়, তাঁর কোনো খলীফারও নয়। এটি লিখেছিলেন তাঁর পুত্র হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.)।
আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নীতি হলো: আকিদার প্রশ্নে চূড়ান্ত দলিল হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর লেখা, তারপর খলীফাগণের ব্যাখ্যা। অন্য কোনো লেখকের শব্দচয়ন বা উপমা সেই মানদণ্ডে বিচার হবে, উল্টোটা নয়। তাই আসল প্রশ্ন হলো: হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে তাঁর আর মহানবী (সা.)-এর সম্পর্ক কীভাবে বলেছেন?
প্রতিষ্ঠাতা নিজে কী বলেছেন?
এক গলতী কা ইযালা পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, তিনি যিল্ল বা ছায়ার পথে মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম পেয়েছেন, আর “ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন হয় না”। তাই খাতামান নাবিয়্যীনের মোহর অটুট থাকে, আর মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
আরও স্পষ্ট ভাষায় তিনি লিখেছেন, তিনি যদি মহানবী (সা.)-এর অনুসারী না হতেন, তাঁর আনুগত্য না করতেন, তাহলে তাঁর নেক আমল পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে গেলেও তিনি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপের সম্মান পেতেন না (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়া, পৃষ্ঠা ২৪)। হাকীকাতুল ওহীতে লিখেছেন, তাঁর প্রভু ও নেতা, নবীগণের গৌরব হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর পথ অনুসরণ না করলে এই অনুগ্রহ পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না; যা কিছু পেয়েছেন, এই অনুসরণের কারণেই পেয়েছেন।
একই অনুচ্ছেদে তিনি আরও লিখেছেন, তিনি তাঁর সত্য ও পূর্ণ জ্ঞান থেকে জানেন যে মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ ছাড়া কোনো মানুষ আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, আর পূর্ণ মারেফাতের অংশও পেতে পারে না। যে পথের একমাত্র দরজা মহানবী (সা.), সেই পথের কোনো পথিক দরজার সমান হতে পারেন না।
যিনি নিজের সব কিছুকে মহানবী (সা.)-এর দান বলেন, তিনি নিজেকে তাঁর সমান দাবি করেছেন, এ কথা তাঁর নিজের লেখার সাথে মেলে না।
কুরআনের পথ: অনুসরণেই উন্নতি
পবিত্র কুরআন আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একটিই পথ দেখিয়েছে:
এখানে উন্নতির সিঁড়ি একটাই: অনুসরণ। অনুসারী যত উঁচুতেই উঠুক, সিঁড়িটি তাঁর নেতার। তাই উদ্ধৃতির “সামনে বাড়ানো” কথাটি ছায়ার উপমার ভেতরেই পড়তে হবে: ছায়া এগোয় কেবল কায়ার সাথে, কায়াকে অনুসরণ করে। আর ছায়া যত কাছেই আসুক, সে কায়ার সাথে লেগে থাকে বলেই কাছে; নিজের জোরে নয়। কাঁধ ছাড়িয়ে মাথার ওপরে ওঠার কথা সেখানে নেই, আর ছায়ার পক্ষে তা সম্ভবও নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কাঁধ বরাবর” কি সমান হওয়া বোঝায় না?
কেউ কেউ বলেন, কাঁধ বরাবর দাঁড়ানো মানেই সমান মর্যাদা। কিন্তু একই বাক্যে নবুওয়তটিকে বলা হয়েছে “যিল্লি”, অর্থাৎ ছায়া। ছায়া আর কায়া এক স্তরের জিনিস নয়; একটির অস্তিত্বই অন্যটির ওপর নির্ভরশীল। বাক্যের একটি অংশ নিয়ে অন্য অংশ বাদ দিলে অর্থ বদলে যায়। আর এ বিষয়ে চূড়ান্ত কথা প্রতিষ্ঠাতার নিজের: ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন নয়।
লেখক তো প্রতিষ্ঠাতার ছেলে; তাঁর কথা কি দলিল নয়?
সম্মানিত বুযুর্গের লেখা শ্রদ্ধার সাথে পড়া হয়, কিন্তু দলিলের স্তর আলাদা। মুসলমানদের মধ্যেও বড় বড় আলেমের লেখা আছে; তাঁদের কোনো উপমা কুরআন-হাদীসের সাথে না মিললে আমরা কুরআন-হাদীসকেই প্রাধান্য দিই। আহমদীয়া মুসলিম জামাতও তেমনি প্রতিষ্ঠাতার স্পষ্ট লেখাকে প্রাধান্য দেয়।
তাহলে আহমদী মুসলমানরা মহানবী (সা.)-কে কোন মর্যাদায় দেখে?
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, খাতামান নাবিয়্যীন, শরীয়তবাহী শেষ নবী হিসেবে। কুরআন বলে, যে আল্লাহ ও এই রসূলের আনুগত্য করবে, সে-ই নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহদের দলে শামিল হবে (সূরা আন-নিসা ৪:৭০)। অর্থাৎ যে মর্যাদাই আসুক, তা আসবে মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের দরজা দিয়ে। দরজা যিনি, তিনি সবার ঊর্ধ্বে।
“যিল্লি নবুওয়ত” কি আহমদী মুসলমানদের বানানো নতুন কথা?
না। ছায়া আর প্রতিচ্ছবির ভাষা মুসলিম বুযুর্গদের লেখায় বহু আগে থেকেই আছে। হযরত মুজাদ্দিদ আলফে সানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.)-এর কথা উদ্ধৃত হয়েছে: বেলায়েতের (ওলী হওয়ার) মর্যাদা হলো নবুওয়তের মর্যাদার ছায়া, আর বেলায়েতের পূর্ণতাগুলো নবুওয়তের পূর্ণতার ছায়া। ইবনে আরাবী (রহ.) ও আল-কাফাভীর মতো আলেমদের লেখা থেকেও দেখা যায় যে এক পূর্ণ মানুষের মধ্যে অন্য পুণ্যাত্মার আধ্যাত্মিক প্রকাশের ধারণা (বুরুয) তাঁদের কাছে পরিচিত ছিল।
অর্থাৎ ছায়ার ধারণাটি নির্ভরশীলতার ধারণা হিসেবেই ইসলামী আধ্যাত্মিক সাহিত্যে পরিচিত। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই পুরোনো ভাষাতেই নিজের অবস্থান বুঝিয়েছেন: তিনি মহানবী (সা.)-এর ছায়া, আর ছায়ার যা কিছু, সবই কায়ার দান।
সব মিলিয়ে: ছায়ার উপমা দিয়ে কেউ সমতা প্রমাণ করতে পারে না, কারণ উপমাটিই নির্ভরশীলতার। আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নিজের লেখা পরিষ্কার: তিনি যা পেয়েছেন, সবই মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের ফল।
সংক্ষেপে
- উদ্ধৃতিটি হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.)-এর বই কালিমাতুল ফসল থেকে; এটি প্রতিষ্ঠাতা বা খলীফার লেখা নয়।
- জামাতের আকিদার মানদণ্ড প্রতিষ্ঠাতা ও খলীফাগণের লেখা।
- প্রতিষ্ঠাতা নিজে লিখেছেন: ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন নয়, আর সব অনুগ্রহ মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের ফল।
- “যিল্লি” শব্দটিই প্রমাণ করে যে এখানে সমতার কোনো দাবি নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Can the idea of zilli or buruzi prophethood be traced back to Islamic tradition? · alislam.org
- Claim of the Promised Messiah · alislam.org
- A Misconception Removed (Eik Ghalati Ka Izala), PDF · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.